শিরোনাম :

  • জবানবন্দিতে বুলুসহ ১৫ বিএনপি নেতার নাম পেয়েছে পুলিশ উখিয়ায় রোহিঙ্গা ক্যাম্পে সন্ত্রাসীদের গুলিতে নিহত ২দুই ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষ, নিহত ২ আইসিসির সেরা হওয়ার দৌড়ে বাংলাদেশের নাসুম
হাওয়া সমাচার
সন্দিপ বিশ্বাস
০৪ আগস্ট, ২০২২ ১১:১৩:০৩
প্রিন্টঅ-অ+

সারাদেশে ১২০০ সিনেমা হল থেকে এখন ৭০/৭৫ টাতে এসে ঠেকেছে, দেশের অর্ধেক জেলাতে কোন সিনেমা হল নেই, এই দৃশ্য কোন সিনেমাপ্রেমির কাছে ভালোলাগার কথা নয়। এর দায় একার কারো নয় আবার এখান থেকে উত্তরণের দায়ও কোন একক ব্যাক্তির নয়, বিষয়টা সামগ্রিক এবং পলিসি মেকিং এর।


সদ্য মুক্তিপ্রাপ্ত ’হাওয়া’ চলচ্চিত্র নিয়ে আলোচনা সামালোচনার ঝড়ো হাওয়া বয়ে যাচ্ছে, এটা বাংলা চলচ্চিত্রের জন্য ইতিবাচক বলে আমি মনে করি। আলোচনা যেকোন ধরনের হতে পারে কিন্তু প্রথমেই বুঝে নিতে হবে যে তার উদ্দেশ্য কি? ঋত্ত্বিক ঘটকের ভাষায় বলতে গেলে 'পৃথিবীতে Apolitical বা অরাজনৈতিক বলে কিছু নেই'। অর্থাৎ সব আলোচনার একটা রাজনৈতিক উদ্দেশ্য আছে।


আমি বলতে চাচ্ছি পৃথিবীর কোন শিল্পকর্মই সকল মানুষের উপভোগ্য হতে পারে না। কিছু মানুষের সেটা খুব ভালো লাগবে কিছু মানুষের কম ভালো লাগবে আবার কারো মোটেও ভালো লাগবে না, এমনটাইতো হওয়া উচিৎ। কিন্তু সবার আগে উচিৎ সকলের মতামতকে সম্মান করা। এই যে দেশের মানুষ হাওয়া চলচ্চিত্রটাকে গ্রহণ করেছে, অনেকে দশ, পনের অথবা কুড়ি বছর পরে শুধুমাত্র হাওয়া দেখার জন্য হলে ফিরেছে, ফিরতে শুরু করেছে। স্টার সিনেপ্লেক্সে হলিউডের চলচ্চিত্র থর এবং একটা বাংলা চলচ্চিত্র নামিয়ে ‘হাওয়া’ দেখানো হচ্ছে, এটা কিসের বার্তা দিচ্ছে। এই বার্তা পুরোপুরি কমার্শিয়াল বা ফর্মূলা সিনেমাকে প্রত্যাখ্যান করার বার্তা, এই বার্তা আর্ট ফিল্মের নামে বস্তাপচা সিনেমাকে ছুড়ে ফেলার বার্তা, এই বার্তা নতুন চলচ্চিত্রকে গ্রহণের বার্তা। অর্থাৎ কারো যদি চলচ্চিত্রটা ভালোলাগে সে ভালো লিখবে, কারো খারপ লাগলে খারপ লিখবে এটাই খুব স্বাভাবিক। কিন্তু যে চলচ্চিত্রটাকে মানুষ গ্রহণ করেছে সেটাকে টেনে হিচড়ে নিচে নামানোর নিরন্তর চেষ্টাকে কি বলা যেতে পারে? হাওয়া চলচ্চিত্রের পরিচালক মেজবাহউর রহমান সুমন একটি চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছেন মাত্র, কারো পাকা ধানে মই তো দেয়নি, তাহলে বিদ্বেষ ছড়ানোর মানসিকতা কেন? চলচ্চিত্রটি আপনার ভালো লাগে নাই এটা নিয়ে পোস্ট দেওয়া দোষের কিছু না, কিন্তু চলচ্চিত্রটাকে প্রতিপক্ষ ভেবে রিপিটেডলি এটাকে অপদস্থ করার মানসিকতা উদ্দেশ্যপ্রণদিত এতে দেশের চলচ্চিত্রের দর্শকদের কাছে ভুল বার্তা পৌছাচ্ছে। কেউ দেখে আবার কেউ না দেখেই হাওয়ার বিরুদ্ধে সমানে কুপিয়ে যাচ্ছে, বিষয়টা যার পর নাই দুঃখজনক। সিঙ্গেল স্ক্রীনের জামানা পাড়ি দিয়ে আমরা মাল্টিপ্লেক্স এর জামানায় চলে এসেছি, দর্শকের রুচি বদলেছে। দেশে বসেই যে দর্শক দেশি বিদেশি ওটিটি প্লাটফর্মগুলোর পৃথিবীর লেটেস্ট টেকনোলোজির ছবিগুলো দেখছে সেই দর্শকে বোকাচোদা ভাবার মতো মূর্খতা আর কিছু হয় না। মূল কথা হলো হাওয়া চলচ্চিত্রটা গদে বাঁধা বানিজ্যিক এবং পুতুপুতু মার্কা আর্ট ঘরনার ছবিগুলোকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দিয়েছে, এর সাফল্য মেনে নেওয়া কঠিন। গত এক দশকের হিসাব যদি ধরি তাহলে দেশে মুক্তি পাওয়া বহু চলচ্চিত্রের নামই মানুষ জানে না, প্রযোজকরা সিংহভাগ চলচ্চিত্রের লগ্নিকৃত অর্ধেক টাকা ঘরে ফেরাতে পারেনি অথচ সুপার হিট ছবির তালিকা করলে ‘আয়নাবাজি’ ‘দেবী’ এবং ‘হাওয়া’র নাম আসবে। এই মিডল সিনেমাগুলো যখন মুক্তি পায় তখন কট্টরপন্থী বানিজ্যিক এবং কট্টর আর্ট ঘরনার এক শ্রেণীর মানুষ ছবিগুলোকে প্রতিপক্ষ ভাবতে থাকে, গাত্রদাহ শুরু হয়ে যায়। ছবিগুলোকে বিভিন্ন কাতারে ফেলে গজরাতে থাকে, যা সত্যিই শিশুসুলভ এবং হাস্যকর। উপরের তিনটি ছবির কোন একজন পরিচালক দাবি করেনি যে তারা সিরিয়াস আর্ট তৈরী করেছেন। তিনজন নির্মাতই বিজ্ঞাপন ইন্ডাস্ট্রি থেকে এসেছে, তারা ভালোভাবে জানে কিভাবে একটা ছবির মার্কেটিং করতে হয়। তাদের মেধা এবং মার্কেটিং পলিসির কারনে ছবিগুলো হিট হয়েছে, এগুলোতো দোষের কিছু নয়। আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্রের খোঁজখবর যারা রাখেন তারা জানবেন যে কোন ছবি নির্মাণের বাজেট যদি ১০ কোটি টাকা হয় তাহলে তার প্রচার প্রচারনার জন্য বাজেট ধরা হয় ২০ কোটি টাকা। আমাদের দেশে এই বিষয়টাকে একদম গুরুত্বই দেওয়া হয় না। পুজিবাদী শিল্প মাধ্যমের এই পলিসিতে যারা ভুল করবে তাদের ছবির মান এবং হলের সংখ্যা কমবে ছাড়া বাড়বে না।


হাওয়ার প্রথম দিন প্রথম শো দেখা শেষ হওয়ার দশ মিনিটের মাথায় একজন চলচ্চিত্র নির্মাতাকে আমি ফোন করে বলেছিলাম হাওয়া চলচ্চিত্রকে বিচার করতে হবে তার মতো করে অন্য কোন চলচ্চিত্রের আলোকে নয়। আমি এখনো বলছি হাওয়া সমালোচনার উর্ধ্বের কোন ছবি নয় কিন্তু একটা বিষয় এখানে খুব গুরুত্বপূর্ণ, আমরা কিসের সামালোচনায় ব্যাস্ত চলচ্চিত্রের না চলচ্চিত্রটির সাফল্যের, এটা প্রত্যেক দর্শকের কাছে পরিস্কার হওয়া জরুরী। কিছু আতেলের কাজ হচ্ছে যে ছবিগুলো ব্যাবসা সফল হবে সেগুলোকে বিভিন্ন ক্যাটাগোরিতে ফেলে যেকোন প্রকারে টেন হিচড়ে নিচে নামানো, এই প্রবণতা খুবই অশুভ।


স্পয়লার VS নো-স্পয়লার নিয়ে উত্তেজিত হওয়ার সময় এখন নয়। বরং আমাদের শেখা উচিৎ হাওয়া টিম কোন কোন টেকনিক এপ্লাই করেছে, তাদের মার্কেটিং পলিসি কি ছিল, গল্পবলার সিক্রেট কি ছিল। যা একটা ইন্ডাস্ট্রি ডেভলপমেন্টে কাজে লাগবে।


‘হাওয়া’ এবং ’পারণ’ চলচ্চিত্রের সাফল্যকে আমি সাধুবাদ জানায় এবং আমি এটাও মনে করি যে একটি চলচ্চিত্রের সাফল্য অনেক নির্মাতাকে উদ্বুদ্ধ করে, আবার ঈর্ষা উদ্বুদ্ধ করে ঈর্ষাকে।


বিংশ শতাব্দীর চলচ্চিত্র তত্ত্বের চোরাবালিতে আটকে থেকে আতলামি না করে এবং একই সাথে আশি/নব্বই দশকের হিট বাংলা সিনেমার আলোকে বিচার না করে ’হাওয়া’কে বিচার করা উচিৎ এই সময়ের ছবি হিসেবে। সম্মান করা উচিৎ যারা ছবিটাকে নিয়েছে তাদের।


শুধু হাওয়া নয়, হাওয়ার মতো যে সকল ছবি হলে দর্শক আনবে, ইন্ডাস্ট্রিকে চাঙ্গা করবে তাদের সকলের জন্য আমার শুভকামনা এবং ভালোবাসা।


০৩.০৮.২০২২

আরো পড়ুন