শিরোনাম :

  • রাজধানীতে ট্রাকের ধাক্কায় বৃদ্ধ নিহত জবানবন্দিতে বুলুসহ ১৫ বিএনপি নেতার নাম পেয়েছে পুলিশ উখিয়ায় রোহিঙ্গা ক্যাম্পে সন্ত্রাসীদের গুলিতে নিহত ২দুই ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষ, নিহত ২
বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকতা সমাচার
২৩ আগস্ট, ২০২২ ১৩:৫২:২৯
প্রিন্টঅ-অ+

বাংলাদেশে সিভিল সার্ভিস (বিসিএস) সহ অন্যান্য যতগুলো ১ম শ্রেণীর সরকারী চাকুরী আছে তাদের নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে শিক্ষাগত যোগ্যতা চাওয়া হয় ন্যূনতম দ্বিতীয় শ্রেণীতে স্নাতক (সহস্নাতকোত্তর) ডিগ্রিধারী হতে হবে এবং একাধিক তৃতীয় বিভাগ গ্রহণযোগ্য নয় (৪৪তম বিসিএস বিজ্ঞপ্তি)। তার মানে দাড়ায় মাধ্যমিক বা উচ্চমাধ্যমিক এর যেকোনো ১টি তে ৩য় বিভাগ থাকলেও একজন চাকুরী প্রার্থী উক্ত পদে আবেদনের যোগ্য বিবেচিত হবেন এবং প্রতিযোগীতার মাধ্যমে তিনি একজন ১ম শ্রেণীর কর্মকর্তা হতে পারেন।


উল্লেখ্য দ্বিতীয় শ্রেণী হল বর্তমান সিজিপিএ ২.৫ বা তদূর্ধ্ব আর ১ম শ্রেণী তথা ৯ম গ্রেডের একজন কর্মকর্তার প্রারম্ভিক মূল বেতন হল ২০১৫ সালের পেস্কেল অনুযায়ী ২২,০০০ টাকা, তবে ক্যাডার কর্মকর্তা হলে একটি অগ্রিম ইনক্রিমেন্ট সহযোগে তা হয় ২৩,১০০ টাকা।


অপরদিকে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকতার জন্য ইউজিসি কর্তৃক প্রভাষক পদে আবেদনের ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতা নির্ধারণ করা হয়েছে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিকে সিজিপিএ ৪.২৫ (৫.০০ স্কেলে) এবং স্নাতক ও স্নাতকোত্তরে সিজিপিএ ৩.৫০ (৪.০০ স্কেলে), কোনকোন বিশ্ববিদ্যালয়ের চাহিদা আর বেশি।


এখানেই শেষ নয়, আরও আছে পাবলিকেশন, মেরিট পজিশন, বা গোল্ড মেডেলিস্ট কিনা ইত্যাদি বহুবিধ চুলচেরা বিশ্লেষণ। মজার বিষয় হচ্ছে এই প্রভাষকদেরও বেতন শুরু হয় ৯ম গ্রেডের সাথে একটি অগ্রিম ইনক্রিমেন্ট সহ ২৩,১০০ টাকা দিয়ে। বিষয়টা এমন যে বাজারে পাঙ্গাস মাছের যে দাম, ইলিশ মাছেরও ওই একই দাম। বাস্তবে সেটা অসম্ভব হলেও বাংলাদেশে সেটা সম্ভব। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুরুপ ন্যূনতম উচ্চ শিক্ষাগত যোগ্যতা আর কোন চাকুরীতে খুজে পাওয়া যাবে না। তাহলে স্বভাবতই এখন প্রশ্ন উঠতে পারে যে কেন শিক্ষার্থীরা মাথার ঘাম পায়ে ফেলে, রাতদিন পড়ালেখা করে বিষয় ভিত্তিক জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জন করবে, কেনই বা ভাল ফলাফল করবে যদি ২য় শ্রেণীতে পাশ করে শুধু নিয়োগ পরীক্ষাতে প্রতিযোগিতা করেই ১ম শ্রেণীর সরকারী কর্তা হওয়া যায়?


এবার আসা যাক বেতন বহির্ভূত উপার্জন ও সুযোগ-সুবিধা বিষয়ে। অধিকাংশ ১ম শ্রেণীর কর্মকর্তাই তাদের সরকারী বেতনের পাশাপাশি কমবেশি স্পিড মানি (সাবেক অর্থ মন্ত্রির ভাষায়) পেয়েই থাকেন, সাথে আরও আছে মিটিং বিল, সিটিং বিল, টি এ/ ডি এ বিল; যা সমাজে তাদেরকে আর্থিক সক্ষমতার দৌড়ে এগিয়ে রাখে।


অন্যদিকে টিচিং কর্মকর্তারা (বিসিএস/নন- বিসিএস) বাস্তব সম্মত কারনেই প্রাইভেট টিউশন করিয়ে ভাল অর্থ উপার্জন করে থাকেন, যেটি বৈধ ও যুক্তিযুক্ত। জুডিশিয়াল ও সামরিক বাহিনীতেও আছে স্বতন্ত্র বেতন কাঠামো, সঙ্গে আধুনিক বাসস্থান, চিকিৎসা, সন্তানদের মান সম্মত শিক্ষার ব্যাবস্থাসহ অন্যান্য সামাজিক মজুরি। অপরদিকে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের না আছে স্পিড মানির কারবার না আছে টিউশন করানোর সুযোগ।


শুধুমাত্র ঢাকায় অবস্থিত কিছু শিক্ষক প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়িয়ে বা কনসালটেন্সি করিয়ে কিছু বাড়তি উপার্জনের সুযোগ পান (সবাই নয়), কিন্তু ঢাকার বাইরের শিক্ষকদের সেই সুযোগ ও নেই। বাড়তি উপার্জনের মধ্যে যেটুকু আছে তা হল পারিতোষিক বিল (খাতা দেখা, প্রশ্ন করা, ও পরীক্ষার ডিউটি করা ) যা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বছরে ৬০-৭০ হাজার টাকার বেশি নয়। যেখানে ঢাকা শহরের অনেক কলেজে প্রভাষকদের ৭ম গ্রেডে বেতন, বিশেষ ভাতা বা নগর ভাতার নামে বিভিন্ন সুবিধা দেওয়া হয় শুধু মানসম্মত শিক্ষকদের আকৃষ্ট করা ও ধরে রাখার জন্য, সেখানে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর চিত্রটা এমন। এই শিক্ষকদের দিয়ে শিক্ষায় আন্তর্জাতিক রাঙ্কিং এ স্থান অর্জনের স্বপ্ন দেখাটাই কি যথেষ্ট নয়?


গাড়ি সুবিধাঃ উন্নত, আকর্ষণীয়, আধুনিক ও আভিজাত্যপূর্ণ জীবনের অন্যতম উপকরণ হচ্ছে গাড়ি। বিভিন্ন চাকুরীতে ৬ষ্ঠ গ্রেড থেকেই সরকারী গাড়ি বরাদ্দ দেওয়া হয়ে থাকে। যেমন জুডিশিয়াল সার্ভিসে শুরু থেকেই (জুডিশিয়াল প্রটোকল), উপজেলা নির্বাহী অফিসার (সরকারী দায়িত্ব সুষ্ঠ ও নির্বিঘ্ন ভাবে পালনের জন্য), সেনাবাহিনীর মেজর (৬ষ্ঠ গ্রেড), উপজেলা প্রানিসম্পদ/কৃষি অফিসার, জেলা শিক্ষা ও প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা (নন ক্যাডার, ৬ষ্ঠ গ্রেড)।


এছাড়াও উপসচিব (৫ম গ্রেড) ও তদূর্ধ্ব পর্যায়ের অফিসাররা নাম মাত্র সুদে ৩০ লক্ষ টাকা সরকারী লোন সহ মাসিক ৩০ হাজার টাকা পরিচালনা খরচ বাবদ পায়, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক এর এজিএম (৪থ গ্রেড) ও গাড়ি সুবিধা পেয়ে থাকে। যেহেতু সার্বক্ষণিক ব্যবহারের জন্য এসব গাড়ি বরাদ্দ করা হয় তাই উক্ত কর্মকর্তাগণ পেশাগত কাজের বাইরেও গাড়িগুলো ব্যক্তিগত কাজ যেমন বাজার-সদাই, পারিবারিক বা সামাজিক কোন অনুষ্ঠানে সগর্ব উপস্থিতি, ফেমিলি মেম্বারদের নিয়ে অবকাশ যাপনে বের হওয়া বা ছেলেমেয়েকে স্কুল বা কোচিং এ আনা নেওয়া করে থাকেন। এসকল কর্মকাণ্ড তাদের সামাজিক মর্যাদা, আভিজাত্য ও অর্থনৈতিক সক্ষমতার পরিচয় বহন করে।


কিন্তু  বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের এমন অভিজাত হওয়ার সুযোগ নেই। ৩০-৪০ জন শিক্ষক কে একসাথে আনা নেওয়ার জন্য আছে লক্কর ঝক্কর বাস, ইদানিং কিছু এসি বাস অবশ্য কেনা হচ্ছে। এসব বাস ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহার করা সম্ভব না। তাহলে একজন অধ্যাপক তার দৈনন্দিন কার্যক্রম যেমন বাজার করা, কোথাও ঘুরতে যাওয়া, সামাজিক/পারিবারিক কোন অনুষ্ঠানে যাওয়া বা তাদের ছেলেমেয়েদের স্কুলে নেওয়া কিভাবে হয়? স্থান ভেদে আছে গনপরিবহন, রিকশা, অটো রিকশা, সিএনজি, বা বড়জোর উবার। অনেকে হয়তো উপায়ন্তর না দেখে স্বল্প মুল্যে সেকেন্ড হ্যান্ড গাড়ি কেনেন কিন্তু তার ব্যবহার ও সীমিত কারন একজন সহযোগী অধ্যাপক বা অধ্যাপক এর যদি স্কুল/কলেজ পড়ুয়া ২ জন ছেলেমেয়ে থাকে এবং তার বাবা-মা যদি জীবিত থাকেন তাহলে ৫০,০০০ বা ৫৬,০০০ টাকায় সংসার চালানো কতটা চাপের বিষয় তা বলার অপেক্ষা রাখেনা, উপরন্তু আবার গাড়ির তেল ও রক্ষণাবেক্ষণ খরচ।


আমাদের এই রাষ্ট্র একজন মেজর, বিচারক, ব্যাংকার, সরকারী অনেক মিড গ্রেড অগুরুত্বপূর্ণ অফিসারদের সম্মান ও স্বার্থ দেখলেও একজন টপ টু বটম ভাল রেজাল্ট ও এমফিল- পিএইচডি ধারী সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠের শিক্ষকদের সম্মান বা সামাজিক মর্যাদা সমুন্নত করনের মাথাব্যথা নেই। এসকল কর্মকর্তাদের জন্য হাজার হাজার কোটি টাকা খরচ করে প্রতিবছর উচ্চ সিসির (২০০০/২৫০০ সিসি) বিলাসবহুল শ্রেণীর এসইউভি গাড়ি কেনা হলেও (ড্রাইভার ও জ্বালানী সহ) বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের জন্য শুল্ক মুক্ত বা বিশেষ শুল্ক ব্যবস্থায় জাপানের ১৫০০ সিসির রিকন্ডিশন গাড়ি আমদানির ও কোন উদ্যোগ বা পরিকল্পনা আমাদের রাষ্ট্রের নেই; ব্রান্ড নিউ এসইউভি গাড়ি, ড্রাইভারও তেল খরচা তো দূরের কথা। উপরন্তু কতটুকু অন্যায্য সমাজ ব্যবস্থা  হলে অনেক অপ্রয়োজনীয় পদকে আপগ্রেড করার বিপরীতে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের চলমান পদকে অবনমন করার ষড়যন্ত্র করা হয় (২০১৫ সালের পে স্কেলের কথা বলছিলাম)!


শিক্ষকদের পদোন্নতি নিয়ে একটু গল্প না করলেই নয়। অন্যান্য পেশার মত এখানে শুধু অভিজ্ঞতা হলেই পদোন্নতি মেলেনা, প্রয়োজন হয় প্রকাশনা ও উচ্চতর ডিগ্রী (এমফিল, পিএইচডি)। নির্দিষ্ট সংখ্যক প্রকাশনা (১২ টি) থাকার পরেও যদি কোন প্রভাষকের উচ্চতর ডিগ্রী (এমফিল, পিএইচডি) না থাকে তাহলে অধ্যাপক পদে (গ্রেড-৩) পদোন্নতি পেতে তার সময় লাগবে ২২ বছর। যদিও এমফিল বা পিএইচডি ডিগ্রী থাকলে এই সময় অনেকটা কম লাগে তবে সেটি তো শিক্ষকের অতিরিক্ত যোগ্যতা। অন্যদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের নন টিচিং পদ যেমন পরিচালক, প্রধান চিকিৎসক/প্রকৌশলী, রেজিস্ট্রার, লাইব্রেরিয়ান প্রভৃতি পদে (গ্রেড-৩) যেতে সময় লাগে ১৫ বছর, যদি কেউ ৯ম গ্রেডে চাকুরী শুরু করেন।


দ্বিতীয় শ্রেণীর স্নাতক ও স্নাতকোত্তরের বাইরে তাদের আর কোন উচ্চতর শিক্ষা বা প্রকাশনার প্রয়োজন পরে না। অন্যদিকে একই যোগ্যতায় ইউজিসির কর্মকর্তা হতে প্রয়োজন ১৪ বছরের অভিজ্ঞতা (অতিরিক্ত পরিচালক, গ্রেড-৩) ও ১৭ বছরের অভিজ্ঞতা (পরিচালক, গ্রেড-২, যদি ৯ম গ্রেডে যোগ দান করে ও ৫ম গ্রেডে ৪ বছরের অভিজ্ঞতা থাকে)।


উপর্যুক্ত তথ্যাদি সম্পর্কে কেউ পুরোপুরি অবহিত থাকা সত্ত্বেও কেন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকতার মত ছাপোষা জীবনকে বেছে নেবে তার চারপাশে এতো এতো জৌলুস ও জাঁকজমক পূর্ণ জীবনের হাতছানি থাকার পরেও?


লেখক : মেজবাহ হোসেন। প্রভাষক, রসায়ন বিভাগ, হাবিপ্রবি। (বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে অধ্যয়নরত)

আরো পড়ুন