শিরোনাম :

  • রাজধানীতে ট্রাকের ধাক্কায় বৃদ্ধ নিহত জবানবন্দিতে বুলুসহ ১৫ বিএনপি নেতার নাম পেয়েছে পুলিশ উখিয়ায় রোহিঙ্গা ক্যাম্পে সন্ত্রাসীদের গুলিতে নিহত ২দুই ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষ, নিহত ২
নীতির প্রশ্নে আপসহীন বঙ্গবন্ধু
ডা, এস এম বাদশা মিয়াঁ
০১ সেপ্টেম্বর, ২০২২ ১৮:০৮:২৩
প্রিন্টঅ-অ+

১৯২০ সালের ১৭ই মার্চ টুঙ্গিপাড়ায় ঐতিহ্যবাহী শেখ পরিবারে জন্ম নেওয়া শেখ মুজিব তার সাংগঠনিক দক্ষতায় বিভিন্ন আন্দোলনের মধ্য দিয়ে বাঙালির স্বাধীনতা আন্দোলনকে ধাপে ধাপে এগিয়ে নিয়ে আসেন। পরিশেষে তার সুযোগ্য নেতৃত্বে 'বাংলাদেশ' নামে একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রের জন্ম হয়। আর এ কাজ করতে তাকে যৌবনের সোনালি দিনগুলো তার কারাগারের মধ্যে কেটেছে। অনেক দুঃখ-কষ্ট নির্যাতন তাকে ভোগ করতে হয়েছে। বাংলার হাজার বছরের ঘুণেধরা সমাজব্যবস্থার পরিবর্তন এবং সুখী-সমৃদ্ধ শোষণমুক্ত সমাজব্যবস্থা গড়ে তোলার ক্ষেত্রে তিনি যে অবর্ণনীয় ত্যাগ স্বীকার করেছেন তজ্জন্য জাতি মুজিবকে 'বঙ্গবন্ধু' উপাধিতে ভূষিত করেন। মুজিব পরাধীন শাসনে আবদ্ধ শোষণ নির্যাতিত বাঙালি জাতিকে মুক্ত করার মানসে তার প্রচন্ড সাংগঠনিক দক্ষতার দ্বারা বাংলার গণমানুষকে ঐক্যবদ্ধ করে স্বাধীনতার অগ্নিমন্ত্রে দীক্ষিত করেছিলেন। অনেক ত্যাগ, তিতিক্ষা, জেল, জুলুম, নির্যাতন সহ্য করতে হয়েছে। এমনকি তাকে ফাঁসির মঞ্চেও যেতে হয়েছে। তবুও তিনি নীতির প্রশ্নে আপস করেননি। স্বাধীনতার পথ থেকে বিচু্যত হননি। আন্দোলনকামী এ মানুষটি যৌবনের অধিকাংশ সময় কাটালেন কারাগারে। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন, চুয়ান্নর যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, আটান্নর আইয়ুববিরোধী আন্দোলন, বাষট্টির শিক্ষা আন্দোলন, ছেষট্টির ঐতিহাসিক ছয়দফা, ঊনসত্তরের গণঅভু্যত্থানে তার সুযোগ্য নেতৃত্বে বাঙালি জাতিকে স্বাধীনতার অগ্নিমন্ত্রে দীক্ষিত করেন। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে বিশ্ব মানচিত্রে বাংলাদেশ স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে স্থান পায়। বঙ্গবন্ধু তার দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে শোষণমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠা করে শোষিত বাংলাকে সোনার বাংলা করার জন্য তার সমগ্র জীবন উৎসর্গ করেন। তিনি নিজের জীবন দিয়ে বাংলার মানুষের ভালোবাসার ঋণ পরিশোধ করে গেছেন। 


একাত্তরের ১৬ই ডিসেম্বর আমরা বিজয় অর্জন করি। দেশমাতা মুক্তি পায়। মুজিব বিধ্বস্ত রাষ্ট্রের দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। বাঙালির দুঃখ-কষ্ট দুর্দশা লাঘবের জন্য তিনি সুস্পষ্ট কতগুলো পরিকল্পনা নিয়ে এগিয়ে আসেন। তার চিন্তা চেতনায় প্রাধান্য পায় গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা, বাঙালি জাতীয়তাবাদের বিকাশ, শোষণমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠা, সব ধর্মের বসবাসের উপযোগী ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তোলা। মুজিবের এ পরিকল্পনাকে মুজিবের রাজনৈতিক দর্শন ও বলা যায়। বঙ্গবন্ধুর এ ধ্যান-ধারণা অনেকেই গ্রহণ করতে পারে না। স্বাধীনতার পর রাষ্ট্র পরিচালনায় তিনি কঠোর হতে পারেননি। তাই তিনি সমালোচনার ঊর্ধ্বে ছিলেন না। তবে এমন এক সময় বাংলাদেশ স্বাধীনতা অর্জন করে যখন বিশ্বের পরাশক্তি আমেরিকা, কমিউনিস্ট চীন ও মুসলিম রাষ্ট্র সৌদি আরব বাংলাদেশ জন্মের বিরোধিতা করেছিল। একদিকে বহিশত্রম্ন অন্যদিকে স্বাধীনতা বিরোধী অপশক্তি একটি বিশেষ মহল সরকারকে ব্যর্থ করতে উঠে-পড়ে লাগে। ফলে বঙ্গবন্ধুকে বহুমুখী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হয়। 


বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করা হয়। তবুও তার সঙ্গে কারও তুলনা হয় না। একটি ঘুমন্ত জাতিকে জাগ্রত করেছেন, শিখিয়েছেন অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের ভাষা। প্রকৃত অর্থেই তিনি ছিলেন এক অসাধারণ সাহসী যোদ্ধা নেতা। এই রকম নেতা যুগে যুগে জন্মায় না। তার সঙ্গে কেবল তুলনা চলে মহত্মা গান্ধী, নেলসন ম্যান্ডেলা, আব্রাহাম লিংকন, ফিদেল ক্যাস্ত্রোর মতো বিশ্ববরেণ্য স্বাধীনতার স্থপতি ও নেতাদের।


১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট এক কালরাত্রিতে মুজিব নিহত হলেন। তারপর মুক্তিযুদ্ধের চেতনা মূল্যবোধগুলো একে একে বিসর্জন হতে লাগল। তিরিশ লাখ শহীদদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীনতা ও পবিত্র সংবিধান হয় কলঙ্কিত। সংবিধান সংশোধন করে ধর্মনিরপেক্ষতাকে বাতিল করে ফলে সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠী আবার রাজনীতি করার অধিকার ফিরে পায়। মুজিবের আত্মস্বীকৃত খুনিরা বিদেশিতে চাকরি পেয়ে হয় পুরস্কৃত। দীর্ঘ একুশ বছর এভাবে দেশ চলতে থাকে। এ সময় যারাই রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত ছিল তারাই স্বাধীনতাবিরোধী ও সাম্প্রদায়িক শক্তির সঙ্গে আঁতাত করে রাষ্ট্র পরিচালনা করে। একাত্তরের ১৬ই ডিসেম্বর বিজয় লাভের মাধ্যমে বাঙালি জাতিকে সাহসী জাতি হিসেবে পরিচিতি লাভ করান শেখ মুজিব। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে বাঙালি পায় স্বাধীনতা একটি মানচিত্র, পতাকা, একটি সংবিধান। সর্বোপরি তার নেতৃত্বে বাঙালি তার নিজস্ব জাতিসত্তায় প্রতিষ্ঠিত হয়। সে স্বাধীন বাংলার স্থপতি, শতাব্দীর মহানায়ক শেখ মুজিবকেই শুধু হত্যা করা হয়নি। পঁচাত্তরের ঘাতকদের হাত থেকে পরিবারের অন্য সদস্য ও রেহাই পায়নি। একুশ বছর রাষ্ট্র শাসকরা মুজিবের নাম বাঙালির হৃদয় থেকে মুছে ফেলার জন্য তার বিরুদ্ধে নানা কুৎসা করে। বিভিন্ন অপপ্রচার চালানো হয় তার বিরুদ্ধে। কিন্তু তাদের সব অপপ্রচার মিথ্যা প্রমাণিত করে বাংলার জনগণ। মুজিবের নাম বাংলার গণমানুষের হৃদয় থেকে যে মুছে যায়নি তা শেখ হাসিনাকে বারবার ক্ষমতায় বসিয়ে বাংলার জনগণ তা প্রমাণ করে।


বঙ্গবন্ধুর জন্ম-মৃতু্য (১৯২০-১৯৭৫) হিসেব করলে মাত্র ৫৫ বছর তিনি বেঁচে ছিলেন। তিনি চেয়েছিলেন একটি সুখী, সমৃদ্ধ বাংলাদেশ ও শোষণহীন সমাজ প্রতিষ্ঠা করে দীর্ঘকাল ধরে শোষিত বাঙলাকে সোনার বাঙলায় পরিণত করা। তার সুযোগ্য নেতৃত্বে বাঙালি জাতি পেয়েছে স্বাধীন সার্বভৌম গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র। আমরা সে রাষ্ট্রের গর্বিত নাগরিক। এসবের জন্য বাঙালি জাতি তার কাছে ঋণী। এ ঋণ কোনোদিন বাঙালি পরিশোধ করতে পারবে না। কিন্তু বঙ্গবন্ধু বাঙালি জাতির ভালোবাসা ঠিকই শোধ করে গেছেন বুকের রক্ত দিয়ে। বাঙালি স্বাধীনতা সংগ্রামে তার অবদান যশখ্যাতি, কীর্তি বাঙালির মন থেকে কোনো দিন মুছে ফেলা যাবে না। বিরোধী মহল এসব নিয়ে সফল হয়নি, ভবিষ্যতেও সফল হবে না। মানুষ মাত্রই স্বাভাবিক মৃতু্য কামনা করে। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর মৃতু্যকে আমরা সভ্য দুনিয়ার মানুষ হিসেবে কোনো ক্রমেই সমর্থন করতে পারি না। বঙ্গবন্ধু আজ আমাদের মাঝে নেই। কিন্তু তার আদর্শ আছে। তার আদর্শ, স্মৃতি উজ্জ্বল হয়ে বিরাজ করছে কোটি প্রাণ বাঙালির হৃদয়ে। যতদিন বাংলাদেশ থাকবে ততদিন তার নাম চিরভাস্বর হয়ে থাকবে। বঙ্গবন্ধু চির শায়িত হয়ে আছেন টুঙ্গিপাড়ায় শ্যামল মাটিতে। কিন্তু টুঙ্গিপাড়ার রূপ আগের মতো আর নেই। বঙ্গবন্ধুর সমাধি সৌধ হওয়ায় সে টুঙ্গিপাড়া আজ যেন বাঙালির তীর্থভূমিতে পরিণত হয়েছে।


সাফল্য-ব্যর্থতা নিয়েই মানবজীবন। শেখ মুজিব তার ঊর্ধ্বে নন। তার দৃঢ় রাজনৈতিক ভূমিকা দেশকে স্বাধীনতা সংগ্রামের শেষ সোপানটিতে পৌঁছে দেয়। একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা, সংবিধান প্রণয়ন, মানচিত্র, ভারতীয় সেনা প্রত্যাহার, দেশ পুনর্গঠনে সফলতার ইতিহাসে তিনি চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন। বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলার যে স্বপ্ন দেখেছিলেন সেটা দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফোটানোর সোনার বাংলা। এ লক্ষ্যে তিনি এগিয়েছিলেন কিন্তু ঘাতকরা তাকে আর এগোতে দেয়নি। তার আদর্শ বাস্তবায়ন ও তার প্রতি যথার্থ ভালোবাসাই সোনার বাংলায় পরিণত হবে এ দেশ। বাঙালি বলে আমাদের কোনো পরিচয় ছিল না। বঙ্গবন্ধুই প্রথম ব্যক্তি যিনি সারাবিশ্বে আমরা যে বাঙালি তার পরিচয় তুলে ধরে প্রতিষ্ঠিত করে গেছেন। বাংলা ভাষার প্রতি তার শ্রদ্ধা, ভালোবাসার টান, ভাষা আন্দোলনে কারাবরণ, অনশন, দেশপ্রেমী উজ্জীবিত হয়ে তিনি বলেছিলেন 'ফাঁসির মঞ্চে যাবার সময় আমি বলব, আমি বাঙালি, বাংলা আমার দেশ, বাংলা আমার ভাষা'। শেখ মুজিব বাঙালি জাতীয়তাবাদের প্রধান প্রবক্তা ও স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ রাষ্ট্রের স্থপতি। বঙ্গবন্ধুর বড় কৃতিত্ব একটি ভাষাভিত্তিক, অসাম্প্রদায়িক স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা। আজ সারাবিশ্বে তার সবচাইতে বড় পরিচয় জাতির পিতা হিসেবে।


মুজিব বাংলার শোষিত, বঞ্চিত নির্যাতিত মানুষের মুক্তির জন্য স্বাধীনতার পথ প্রশস্ত করতে বাংলার জনগোষ্ঠীকে স্বাধীনতার অগ্নিমন্ত্রে উজ্জীবিত করে গেছেন। মুজিবের রাজনৈতিক জীবনের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য ছিল, বাংলার মানুষকে শোষণের হাত থেকে রক্ষা করা। বাংলার গণমানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠায় স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা।


পাকিস্তানির দুঃশাসনের হাত থেকে বাঙালি জাতির অধিকার প্রতিষ্ঠায় তাকে অনেক দুঃখ-কষ্ট, জেল জুলুম নির্যাতন সহ্য করতে হয়েছে। এজন্য তাকে যৌবনের অধিকাংশ সময় কাটাতে হয়েছে অন্ধ কারাগারের প্রকোষ্ঠে। আমরা যদি যুগ যুগ ধরে একটি লালিত বাঙালির স্বাধীন রাষ্ট্র গঠনের কথা ভাবি তাহলে ইতিহাসের আলোকে মুজিবকে সে রাষ্ট্র গঠনের নায়ক হিসেবে তাকে সম্মান দিতে হবে। কারণ তিনিই স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতা। আমাদের বাঙালি জাতির পিতা। হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির জনক শেখ মুজিবুর রহমানকে নৃশংসভাবে হত্যা করে একদল বিপথগামী সেনা কর্মকর্তা। এ জঘন্য হত্যাকান্ড তৈরি করে রাজনৈতিক শূন্যতাও ব্যাহত হয় গণতান্ত্রিক উন্নয়নের ধারা। বঙ্গবন্ধুর হত্যার পর কিউবার সাবেক প্রেসিডেন্ট এবং কিংবদন্তি ও বিপস্নবী নেতা ফিদেল ক্যাস্ত্রো বলেছিলেন, 'আমি হিমালয় দেখিনি, কিন্তু শেখ মুজিবকে দেখেছি, ব্যক্তিত্ব ও সাহসিকতায় তিনি হিমালয়ের মতো।' যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী জনকেরি বলেন. 'সহিংস ও কাপুরুষোচিতভাবে বাংলাদেশের জনগণের মাঝ থেকে এমন প্রতিভাবান ও সাহসী নেতৃত্বকে সরিয়ে দেওয়া কী যে মর্মান্তিক ঘটনা।' কিন্তু দুর্ভাগ্য বাঙালি জাতির। যে পাকিস্তানি বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করতে পারেনি তাকে আমরা হত্যা করেছি। এর চেয়ে বাঙালি জাতির কলঙ্ক আর কী হতে পারে! বাঙালির জাতির জীবনে এমন কোনো নেতার আবির্ভাব ঘটবে যে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী নিজ হাতে বঙ্গবন্ধুর গাড়ির দরজা খোলেন। এমন অভূতপূর্ব ও বিরল সম্মানের অধিকারী ছিলেন বঙ্গবন্ধু। এমন মহান ব্যক্তি যুগাবতার অনেক জাতির ভাগ্যে জন্মায় না।


লেখক- প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি, বঙ্গবন্ধু স্মৃতি সংসদ ও স্মৃতি পাঠাগার

আরো পড়ুন