শিরোনাম :

  • রাজধানীতে ট্রাকের ধাক্কায় বৃদ্ধ নিহত জবানবন্দিতে বুলুসহ ১৫ বিএনপি নেতার নাম পেয়েছে পুলিশ উখিয়ায় রোহিঙ্গা ক্যাম্পে সন্ত্রাসীদের গুলিতে নিহত ২দুই ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষ, নিহত ২
শাওনের মৃত্যু : শকুনের কান্না!
০৪ সেপ্টেম্বর, ২০২২ ১৫:৫৮:২৩
প্রিন্টঅ-অ+

দিন তারিখ মনে নাই। তবে ঘটনাটা ৯১সালের। তখন স্কুলে পড়ি। আমাদের বাড়ির অদূরে রাস্তার পাশে একটা বড় শিমুল গাছ ছিল। পাশের বাজারে দুটি বৃহৎ বট গাছও ছিল। ঐ গাছে জ্বিন থাকত- এমন রটনার ভয়ে সন্ধ্যার পর সে রাস্তা ব্যবহার করতে ভয় হতো। ঐ গাছে শকুনও থাকত। ঝাঁকে ঝাঁকে শকুন। একদিন গ্রামে কারো একটা গরু মারা গেল। মরা গরুটা ফেলা হলো শিমুল গাছের পাশে কোনো উচু জায়গায়। শকুনগুলো দু'একদিনের ব্যবধানে গরুটা খেয়ে ফেলল। আমাদের গ্রামে তখন খুরা রোগে অনেক গরুই মারা যেত। মহিষও মারা যেত। শকুনদের তাই খাবারের অভাব হতো না। তবুও শকুনরা তৃপ্ত হতো না কখনোই। দেখতাম  জীবিত গরু মাঠে ঘাস খেতে খেতে কখনো কখনো বিশ্রাম নিতে শুয়ে পড়ত। ঘাড় ও মাথা মাটিতে লেপটে দিত। সেই জীবিত গরুকে মৃত ভেবে তার ওপর শকুনরা দল বেঁধে ঝাঁপিয়ে পড়ত। অবশ্য গরু জেগে উঠলে শকুনরা পালিয়ে যেতো।


এদিকে নারায়নগঞ্জে পুলিশ-রাজনৈতিক কর্মীর সংঘর্ষের সময় গুলিতে নিহত হওয়া শাওনকে নিয়ে চলছে টানাটানি।  আওয়ামী লীগ-বিএনপি দু'দুলই শাওনকে নিজেদের কর্মী দাবী করছে।বেচারা বেঁচে থাকলে হয়তো বুঝতে পারত তার জীবনের কত মূল্য? আর মরার পরই বা কত মূল্য।


এখানে সবচেয়ে মজার বিষয় হলো- পুলিশ বলছে শাওনের ভাই ফরহাদ 


থানায় মামলা করেছে। তাতে বলা হয়েছে শাওন বিএনপি কর্মীদের গুলিতে নিহত হয়েছে। অথচ প্রথম আলোর রিপোর্ট অনুযায়ী ফরহাদ বলছেন তিনি মামলা করেননি। এমনকি পুলিশ এও বলছে যে শাওন বিএনপি কর্মী ছিল না। সে ছিল আওয়ামীলীগের। 


এখানে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হলো - আপনার আমার করের টাকায় কেনা বুলেট বিদ্ধ হচ্ছে  আপনার আমার স্বজনেরই বুকেই্। করের টাকায় কেনা বুলেট যেখানে অপরাধীর বুকে বিধার কথা সেখানে কি হচ্ছে আমরা সবাই কমবেশি বুঝতে পারি। শুধু পারি না বলতে। কারণ এখানে তো কোন ভারসাম্য নেই। রাজনীতি, অর্থনীতি, পরিবেশ কোথাও ভারসাম্য নেই। বিশেষ করে ক্ষমতা ব্যবহারের ক্ষেত্রে  সবচেয়ে বেশি ভারসাম্যহীনতা।  আর এই  পরিবেশের ভারসাম্যহীনতাই যেমন শকুনকে বিতাড়িত করেছে। ঠিক তেমন ক্ষমতার ব্যবহারের বেলায় ভারসাম্য না থাকায় শাওনরা নিহত হন অকাতরে। জবাবদিহিতার বালাই নেই রাজনীতিতে। ফলে খুব সহজেই যে কাউকে চাইলেই হজম করে ফেলা যায়। 


ওদিকে ২০১৪ সালের জরিপ বলছে বাংলাদেশে বর্তমানে মাত্র ২৬০ টি শকুন আছে। যেগুলো সবই বাংলা শকুন। 


আরো পাঁচ জাতের শকুন দেখা যায়। কিন্তু সেসব প্রজাতির শকুন অনিয়মিত ভিত্তিতে দেখা যায়। প্রকৃতি সংরক্ষণ বিষয়ক আন্তর্জাতিক ইউনিয়ন আইইউসিএন বলছে, শকুন এখন সংস্থাটির লাল তালিকাভুক্ত প্রাণী।


এর মানে হচ্ছে, প্রকৃতি থেকে যদি কোন প্রাণীর মোট সংখ্যার ৯০ শতাংশই হারিয়ে গিয়ে থাকে তাহলে সেটি রেডলিষ্ট বা লাল-তালিকাভুক্ত প্রাণী হয়।


যদিও এ দেশে এমন কি বর্তমান বিশ্বে মানুষরুপী শকুনের কোন অভাব নেই। সর্বত্রই মানুষরুপী শকুন। 


আজ ৩ সেপ্টেম্বর, আন্তর্জাতিক শকুন সচেতনতা দিবস। প্রতি বছরের সেপ্টেম্বর মাসের প্রথম শনিবার এ দিবসটি পালিত হয়। গত বছর দিবসটি ছিল ৪ সেপ্টেম্বর। বর্তমানে ভারতীয় উপমহাদেশে ১১ হাজার শকুন টিকে আছে রীতিমত যুদ্ধ করে। অথচ ৮০ এর দশকে এ অঞ্চলে অন্তত ৪ কোটি শকুন ছিল।  পরিবেশ রক্ষায় ভারতের হিমাচলে শকুনের কৃত্রিম প্রজনন কেন্দ্র গড়ে তোলা হয়েছে। নেপালেও শকুকনের জন্য গড়ে তোলা হয়েছে রেস্টুরেন্ট। সে অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশের হবিগঞ্জে শকুনের খাবারের জন্য একটি ফিডিং স্টেশন বানানো হয়েছে বন অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে। 


এখন তো শকুন এ দেশ থেকে প্রায় বিলুপ্ত। তবে ঘরে ঘরে, আপনার আশপাশে সবখানে মানুষরুপী শকুনের অভাব নেই। এরা ওঁত পেতে থাকে কখন আপনি বিশ্রামে, ছুটিতে কিংবা চোখের আড়ালে যাবেন। ব্যস তখন এরা আপনার স্থান দখলের জন্য মরিয়া হয়ে উঠবে। পারুক বা না পারুক। তেলবাজি, চাপাবাজি, ধাপ্পাবাজিসহ যত রকম বাজি আছে সবই খেলবে। তাও অন্যের আসন দখলের চেষ্টা করবে। এখানে অবশ্য অগ্রজদেরও প্রশ্রয় থাকে অনেক ক্ষেত্রে।


যাইহোক, আশপাশে তাকিয়ে দেখুন, শকুন কোথায় আছে? চিনতে পারলে এড়িয়ে চলুন। ফাঁদ এরা পাতবেই। সেই ফাঁদে পা দেয়া যাবে না। এদের গিফট, সহযোগিতা, সহায়তা, পাওনা কোনো কিছু দিয়ে তৃপ্তও করতে পারবেনা না। ফলে এদের এড়িয়ে চলুন। তারচেয়েও বড় কথা, শকুনের কখনো পেট ভরে না। শকুন সাধারণত লোকচক্ষুর অন্তরালে বাসা বাঁধে। মানুষরুপী শকুনরাও একই স্বভাবের হয়ে থাকে।


শকুনই একমাত্র প্রাণী, যা রোগাক্রান্ত মৃত প্রাণী খেয়ে হজম করতে পারে এবং অ্যানথ্রাক্স, যক্ষ্মা, খুরারোগের সংক্রমণ থেকে অবশিষ্ট জীবকুলকে রক্ষা করে। প্রসঙ্গত, অ্যানথ্রাক্স আক্রান্ত মৃতদেহ মাটিতে পুঁতে রাখলেও তা একশ বছর সংক্রমণক্ষম থাকে। তাই শকুন আমাদের বন্ধুও বটে। 


উইকিপিডিয়ার তথ্যমতে, শকুন এই পৃথিবীতে আছে অনেক আগে থেকে, প্রায় ২৬ লক্ষ বছর ধরে। শকুনের সাধারণ একটা বৈশিষ্ট্য হচ্ছে- এদের মাথায় পালক নেই, চক্ষু খুব ধারালো। এরা ময়লার ভাগাড় থেকে খাবার খুঁজে খায়। অনেক উপর থেকে এরা মৃত পশুর দেহ দেখতে পায়, তারপর সেখানে নেমে আসে, তারপর সেই মৃত পশুর দেহ দ্রুত সাবাড় করে। তাদের পাকস্থলীর ধারণ ক্ষমতা অসাধারণ। মৃত পশুর দেহ তো বটেই, তাদের হাড় পর্যন্ত হজম করে ফেলতে পারে শকুন।


একইভাবে ভারসাম্য ও জবাবদিহিতা না থাকলে মানুষকে খুব সহজেই খেয়ে ফেলতে পারে রাজনীতি নামক অপরাজনীতিই। এমন কি জীবিত মানুষ ধরে নিয়ে গিয়ে গুমও করে ফেলা যায় অতি সহজে। কারণ মানুষরুপী শকুনের অভাব তো নেই এ সমাজে। 


আগের দিনে শকুনকে মানুষ এক ধরনের উপদ্রব মনে করতো। 


তবে সেইসব মানুষের ধারণা আজ সত্যিই হয়েছে। মনুষ্যরুপী শকুন তো সমাজের মাঝে উপদ্রব হয়েই দেখা দিয়েছে। এই উপদ্রব থেকে বাঁচতে হলে মানুষরুপী শকুনের বিরুদ্ধে গড়ে তুলতে হবে সামাজিক আন্দোলন।  আসুন সেটাই করি। নিপাত যাক মনুষ্যরুপী শকুন। বংশবৃদ্ধি হোক পরিবেশ বন্ধু শকুনের।

আরো পড়ুন