শিরোনাম :

  • নয়াপল্টনে বিএনপির নেতাকর্মীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ জবানবন্দিতে বুলুসহ ১৫ বিএনপি নেতার নাম পেয়েছে পুলিশ সেনা অভ্যুত্থানবিরোধী বিক্ষোভে উত্তাল সুদান, সংঘর্ষে নিহত ৭দুই ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষ, নিহত ২
রাজনীতিতে তারুণ্যের আস্থা
১০ ফেব্রুয়ারি, ২০২২ ১২:১০:৩৪
প্রিন্টঅ-অ+

রিয়াজ মাহমুদ


আন্দোলন সংগ্রামের উর্বর ভ‚মি বাংলাদেশ। দুইশত বছর ইংরেজ শাসনের ভয়াবহতার কথা পঠিত বা আলোচিত হতে থাকলেও নিরবিচ্ছিন্ন লড়াইয়ের কথা তেমন একটা আলোচিত হয় না। আগামী প্রজন্ম সেই অদম্য লড়াইয়ের কথা জানুক তা কোন ক্ষমতাসীনরাই চায় নাই। ফলে সংগ্রামের মাঝে মানুষের সব রকমের মুক্তির পথের দিশা, এই উপলব্ধিবোধ হারিয়ে তরুণ প্রজন্ম দ্বারস্ত হচ্ছে- ১. মৌলবাদি চিন্তার ২. মাদকতার ৩. আত্মহত্যার। পূর্ব পুরুষদের অপ্রতিরোধ্য লড়াইয়ের ফলাফল আজকের সমাজ। সেই লড়াইয়ের উত্তাপে ভবিষ্যৎ গড়বে এবং আগামী প্রজন্মের জন্য নতুন নতুন সংগ্রামের পথ রচনা করবে। তাই মানব জীবনের ধর্ম।


এত সংগ্রাম, এত লড়াই ও এত আত্মত্যাগে ইতিহাস মানুষের সামনে তুলে ধরবে কারা? প্রশ্নটার জবাব খুবই সহজ। তবে আজকের প্রেক্ষিতে তার জবাব খুবই কঠিন। কারণ মানুষ সব কিছু করতে চায়। যেমন, সন্তানের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ চায়, বৃদ্ধ পিতা মাতার দায়িত্ব নিতে চায়, কিছু মানবিক কাজও করতে চায়। কিন্তু যেটা করতে চাওয়া দরকার সেই রাজনীতিই মানুষ করতে চায় না। মানুষের শরীরে ফুসফুসের বাস।


প্রতিনিয়ত আমরা শ^াস-প্রশ^াস নিতে পারি এই ফুসফুসের জন্য। এখন কেউ যদি মনে করে আমি ফুসফুস ছাড়াই শ^াস নিব। সেটা অনুর্বর মস্তিষ্কের কল্পনা ছাড়া আর কিছুই নয়। তেমনি সমাজের ফুসফুস রাজনীতি। তার থেকে পালিয়ে বাঁচার বিকল্প কোন উপায় নেই। সংগ্রামের মধ্য দিয়ে রজনীতির গতিপথ নির্ধারণ করতে হয়। কিন্তু রাজনীতির মত এত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আজকের প্রজন্ম যুক্ত হতে চায় না কেন? এর প্রধানত দুইটি কারণ। প্রথমত, নয়া উদারিকরণের প্রভাব। নয়া উদারিকরনের প্রভাবে মানুষকে সংগ্রাম থেকে দূরে রাখতে সব রকম হেন তৎপরতা চালায় সামাজ্যবাদি শক্তিগুলো। আপনি বাঁচলে বাপের নাম-এ দীক্ষায় দীক্ষিত করতে উঠে পড়ে লেগে আছে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, শিল্প-সাহিত্য উভয়ই। মানুষের চোখ কে আটকিয়ে দিয়েছে বাণিজ্যিক খেলায়, সিনেমায়। তরুণ্যকে ধাওয়া করছে সেলিব্রেটি হওয়ার উন্মাদনায়। তারা টিভির পর্দায় খেলা দেখে কিন্তু নিজের খেলার মাঠের সংকট। সে সংকট কাটানোর কথা ভাবনায়ও আসে না।


দ্বিতীয়ত, রাজনৈতিক প্রভাব। একটা সমাজে অবস্থিত বাস্তবতায় রাজনীতি দুটো রাস্তা ধরে হেঁটে যায়। এর অবস্থান পাশাপাশি হলেও কেউ কারো পরিপূরক নয়। সম্পূর্ণ আলাদা। এক পথে আছে দেশপ্রেম, সাম্যের চেতনা, মানুষের প্রতি মানুষের দায়িত্ববোধ, দেশ ও দশকে জানা। অন্য পথে আছে অন্যের মাথায় কাঁঠার ভেঙ্গে খাওয়া, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজ, দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতি। এক পথ এগিয়ে গেলে আরেক পথ পিছিয়ে পড়ে। আজকের সময়ের বাস্তবতায় দ্বিতীয় পথটি নির্বিঘেœ এগিয়ে গেছে বহুদূরে। ঘৃণিত, লাঞ্ছিত, অপমাণিত ও দুর্দশার রাজনীতির এই পথে তরুণরা আর আসতে চায় না। পিতা মাতাও আগের মত এখন উৎসাহ দেয় না। যাও রাজনীতি করো! প্রশ্ন থেকেই যায় এই পথ এত প্রশস্ত হল কেমন করে? এটার সহজ, সাধারণ এবং সঠিক জবাব হল যারা দেশপ্রেমের ও মানুষের প্রতি দায়িত্বপালনের রাজনীতি করে তাদের অভ্যন্তরীন সাংগঠনিক দুর্বলতা।


এই দেশের মানুষ বরাবরই এই সমস্ত দেশপ্রেমের ও মানুষের প্রতি দায়িত্বপালনের রাজনীতিতে উজ্জিবীত সংগঠনগুলোকে নানাভাবে সহযোগিতা করেছে। অর্থ দিয়ে, সময় দিয়ে, সন্তান দিয়ে, খাইয়ে, কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করে এদের উন্নতি তরান্বিত হোক সে প্রত্যাশা করেছে। কিন্তু এরা বরাবরই মানুষকে দেওয়া প্রতিশ্রæতির সাথে বিশ^াস ঘাতকতা করে বিছিন্ন হয়ে পড়েছে। নিজেরা ভিতর থেকে সাংগঠনিক, আদর্শিক উভয়ভাবে ভেঙ্গে খান খান হয়ে গেছে। কিন্তু বাহিরে জৌলুসতা দেখিয়ে চলেছে। কাজেই এরা মানুষের ভালোবাসা পেলেও তা ধরে রাখতে পারে নি।


মানুষের একতার কথা বলে সভা সেমিনার স্বর গরম করলেও নিজেদের ইতিহাস এক ভয়ংকর রকমের ব্যর্থতার ও বিছিন্নতার ইতিহাস। তাই এই রাজনীতিও মানুষকে আশাবাদি করতে পারে নি। যুবকদের মন জয় করে সংগঠনে যুব শক্তির উদ্বোধন করতে পারে নি।


মানুষ জন্মগতভাবে সংগ্রামী। সে অন্যায় দেখলে প্রতিবাদ করতে না পারলেও মনে মনে কষ্ট অনুভব করে। সংঙ্গবদ্ধ হলে প্রতিরোধ করে। কিন্তু রাজনীতি বিমুখ এই তারুণ্য বা যুব শক্তি কি সংগ্রাম বিমুখ? গত কয়েক দশকের অভিজ্ঞতা হল-না। তরুণরা রাজনৈতিক সংগঠন বিমুখ তবে সংগ্রাম বিমুখ নয়। তারা লড়াই করে তবে সংগঠন করে না। লড়াই করতে গিয়ে সংগঠন গড়ে তোলে। তবে সেখানে আদর্শ-উদ্দেশ্য খুব সুদূর প্রসারী নয়। যা নিয়ে লড়ছি তাতেই সফল হতে চাই।


কিছু কিছু আন্দোলন সফল হয় বটে তবে অধিকাংশই হারিয়ে যায় ক্ষমতাসীনদের দমন পীড়নের ফলে। তবুও তারা লড়ে যায় এবং ¯েøাগান তোলে- যদি তুমি ভয় পাও তবে তুমি শেষ, যদি তুমি রুখে দাঁড়াও তবে তুমিই বাংলাদেশ। বাংলাদেশ নামের সাথে রুখে দাঁড়ানো ওতোপ্রতোভাবে জড়িয়ে আছে। তরুণরা তা ভুলে না। তারা প্রতিরোধের প্রতিচ্ছবি বাংলাদেশেই দেখতে পায়। অনেকেই তাতে প্রশ্ন তোলেন এই সমস্ত আন্দোলনের ভবিষ্যৎ কোথায়? আসলে ভবিষ্যৎ’র ভিত্তিভ‚মিটা তারাই প্রস্তুত করছে তিলে তিলে। ইতিহাস ঘাটলে দেখা যায়- ইংরেজ শাসনের বিরুদ্ধে শক্তিশালী প্রতিরোধ আন্দোলন গুলো রাজনৈতিক সংগঠনগুলো গড়ে তোলে নি কিংবা সেগুলো


রাজনৈতিক আন্দোলনও ছিল না। যেমন ফকির সন্যাস বিদ্রোহ, হাজং বিদ্রোহ, নানকার বিদ্রোহ এবং যুব বিদ্রাহ। অধিকাংশ আন্দোলই সফল হয়নি। কিন্তু এমন এক বিদ্রোহের উত্তাপ তৈরি করেছে যে আগুনে শাসকের মসনদপুড়ে ছারখার হয়ে গেছে। এ আন্দোলনের ব্যর্থতা শিখিয়েছে অন্য আন্দোলন কিভাবে গড়ে তুলতে হবে।


বৃষ্ট্রিশ শাসনের অবসান হওয়ার পরও আন্দোলনের তাপ কমে নি। সেই তাপে পুড়ে গিয়েছে পাকিস্তানি শাসন। আমরা স্বাধীন হলাম। বিগত দশকের প্রারম্ভে যুদ্ধপারাধীদের ফাঁসির দাবিতে সংগঠিত আন্দোলন, কিংবা নিরাপদ সড়ক ও কোটা সংস্করণ আন্দোলন আমাদের চোখের সামনে পর্দা খুলে দিল। লক্ষ ঠিক রেখে এগিয়ে যাওয়া যায়। সংগঠিত হওয়া যায়। এখন প্রশ্ন আসতে পারে তাহলে সংগঠন করে কি লাভ? তারা তো বরাবরই ব্যর্থ, মানুষের আস্থা তাদের উপর নেই। অভিযোগগুলো সত্য। এক বিন্দুও মিথ্যা নয়। তবে স্বতঃস্ফ‚র্ত আন্দোলন তাৎক্ষণিক অবস্থার একটা সামাধান আনতে পারে। তবে ব্যবস্থার বদল ঘটাতে পারে না। কিংবা জনগণের মধ্যে আন্দোলন গড়ে উঠার পূর্বে সে বিষয়ে যৌক্তিক বিশ্লেষন দাঁড় করানো ও তার পক্ষে-বিপক্ষে যুক্তি-তর্ক হাজির করার জন্য সংগঠন অতি গুরুত্বপূর্ণ। অতীতে যে সমস্ত আন্দোলন শাসকের পরিবর্তে শাসক নয়। বরং ব্যবস্থা বদল করেছে।


তার পিছনে ছিল সংগঠনের দীর্ঘ দিনের শ্রম, ঘাম ও রক্ত। তাই সংগঠন ও অত্যাধিক গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু তরুণদের রাজনীতি বিমুখিতা কোন পথে নিয়ে যাবে আমাদের ভবিষ্যৎকে? এর সহজ জবাব হল এক প্রতিবাদহীন মেনে নেওয়া বা মানিয়ে নেওয়ার সমাজে দিকে নিয়ে যাবে বাংলাদেশকে। আশার কথা হল তরুণরা সংগ্রাম বিমুখ নয়। সংগ্রাম করতে করতেই খুঁজে নিবে তাদের রাজনীতিক ভবিষ্যৎ। অথবা দেশপ্রেম, সাম্যের চেতনা, মানুষের প্রতি মানুষের দায়িত্ববোধ, দেশ ও দশকে জানা সংগঠনগুলো পুনরায় নতুন শক্তি ও নতুন উদ্যেম নিয়ে অভ্যন্তরিক সংকট কাটিয়ে উঠতে পারলেই তরুণদের আস্থা ও ভরসার স্থান হয়ে উঠতে পারে।

আরো পড়ুন