
সরকার হয়রানি ও দুর্নীতিমুক্ত ভূমি সেবা ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলতে চায় বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি আরও জানান, সারা দেশে আদালতে বিচারাধীন ৪৭ লাখেরও বেশি মামলার মধ্যে অধিকাংশই ভূমি সংক্রান্ত। দ্রুততম সময়ে এগুলো নিষ্পত্তি এবং বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি উৎসাহিত করা সরকারের অগ্রাধিকার। এ সময় কৃষি জমির অপব্যবহার রোধে সবাইকে সতর্ক থাকার নির্দেশ দেন তিনি।
মঙ্গলবার (১৯ মে) সকালে রাজধানীর তেজগাঁও ভূমি ভবনে আয়োজিত তিন দিনব্যাপী ভূমি সেবা মেলার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি এ কথা বলেন।
এর আগে প্রধানমন্ত্রী ভূমি মন্ত্রণালয়ের তিনটি বিশেষ প্রকাশনা ‘ভূমি সেবা মেলা ২০২৬’ এর স্মারক, জনসচেতনতামূলক প্রকাশনা ‘ভূমি আমার ঠিকানা’ ও ‘ভূমি সেবায় অভিযোগ ব্যবস্থাপনা নির্দেশিকা ২০২৬’ এর মোড়ক উন্মোচন করেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘প্রযুক্তিগত উন্নয়নের সাথে সাথে ভূমি ব্যবস্থাপনাও আধুনিক হয়েছে। সেবা গ্রহীতারা নিজের জমি-জমা সংক্রান্ত বিষয়গুলো বর্তমানে ঘরে বসেই অনলাইনে সম্পন্ন করতে সুযোগ পাচ্ছেন। এমনকি যারা অনলাইনে নিজের জমিজমার খাজনা প্রদান কিংবা প্রয়োজনীয় কার্যক্রম করতে সক্ষম নন, তাদের জন্য রয়েছে ভূমি সহায়তা সেবা কেন্দ্র। বেসরকারি উদ্যোক্তাদের পরিচালনায় ইতোমধ্যেই দেশের ৬১টি জেলায় বর্তমানে ৮৯৩টি ভূমি সেবা সহায়তা কেন্দ্র চালু রয়েছে। এসব কেন্দ্র থেকে নির্ধারিত সেবামূল্যের বিনিময়ে নাগরিকরা সহজেই ভূমি সেবার আবেদন করতে পারছেন এবং সরকারি ফি পরিশোধ করতেও সক্ষম হচ্ছেন। পর্যায়ক্রমে দেশের প্রতিটি ইউনিয়নে এ ধরনের আরও ভূমি সেবা সহায়তা কেন্দ্র স্থাপনের পরিকল্পনা সরকারের রয়েছে এবং নাগরিকদের হাতের মুঠয়ে ভূমি সেবা পৌঁছে দিতে চালু করা হয়েছে মোবাইল অ্যাপ—ভূমি।’
তিনি বলেন, ‘আমি মনে করি, ভূমি-জমি ব্যবস্থাপনা যত বেশি আধুনিক এবং প্রযুক্তিনির্ভর করা যায়, জমি সংক্রান্ত বিরোধ সমাপ্তির পথও খুব সম্ভবত তত বেশি সহজ হয়ে যায়। জমি ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে অনলাইন সুবিধা নিশ্চিত করায় আমি ব্যক্তিগতভাবে বিশ্বাস করি, জমি-জমা সংক্রান্ত দুর্ভোগ অনেকাংশেই লাঘব পাবে। একইসঙ্গে জমি-জমা সংক্রান্ত বিরোধকে কেন্দ্র করে ভূমি অফিসগুলোতে মধ্যস্বত্ব ভোগীদের দৌরাত্ম্য কমবে। চলমান এই ভূমি সেবা মেলা আধুনিক ভূমি ব্যবস্থাপনা এবং নাগরিককে নিজেদের দায় দায়িত্ব সম্পর্কেও আরও সচেতন করবে।’
তারেক রহমান বলেন, ‘এটি খুব গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যে, দেশের জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে আমাদের মাথাপিছু জমির পরিমাণও কমে আসছে। ফলে জমির অর্থনৈতিক মূল্য যেমন বাড়ছে, তেমনই জমি নিয়ে বিরোধ, মামলা, মোকদ্দমা এবং জটিলতাও বাড়ছে। অনেক ক্ষেত্রে এসব বিরোধ ব্যক্তি ও পরিবারের শান্তি নষ্ট করার পাশাপাশি জাতীয় উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এমন বাস্তবতায় ভূমির পরিকল্পিত ব্যবহার, নির্ভুল রেকর্ড সংরক্ষণ এবং দক্ষ ব্যবস্থাপনা বর্তমানে সময়ের অপরিহার্য দাবি।’
‘উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করে জরিপ কার্যক্রম পরিচালনার মাধ্যমে নির্ভুল ভূমি রেকর্ড প্রস্তুত করতে ভূমি মন্ত্রণালয় কাজ করছে। একইসঙ্গে ভূমি প্রশাসনের প্রায় সব সেবাকে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে নিয়ে এসে নাগরিকদের জন্য সেবা গ্রহণকে আরও সহজ, দ্রুত এবং কার্যকর করারও উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আমাদের লক্ষ্য এমন একটি ভূমি ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা, যেখানে ভূমি সেবা গ্রহণের জন্য মানুষকে আর অযথা অফিসে ঘুরতে হবে না অথবা দুর্নীতি বা হয়রানির শিকার হতে হবে না,’ বলেন প্রধানমন্ত্রী।
ভূমি সেবা মেলার আয়োজনের মাধ্যমে বিএনপি সরকার জনগণের কাছে আরও একটি নির্বাচনী ইশতেহার পূরণ করতে যাচ্ছে উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, ‘সরকার পর্যায়ক্রমে একের পর এক নির্বাচনী ইশতেহারের প্রতিটি দফা বাস্তবায়নের মাধ্যমে জনগণের কাছে দেওয়া ওয়াদা পূরণের রাজনীতিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে। শুধুমাত্র জমিজমা সংক্রান্ত বিষয় নয়। প্রতিটি ক্ষেত্রেই জনবান্ধব কর্মসূচি নিয়ে সরকার জনগণের কাছে দায়বদ্ধ থাকতে চায়। কারণ দীর্ঘ দেড় দশকের বেশি সময় ধরে ফ্যাসিবাদী শাসন-শোষণের জাঁতাকলে পিষ্ট দেশের জনগণ বর্তমানে রাষ্ট্র এবং রাজনীতিতে তাদের অধিকারের প্রতিফলন দেখতে চায়। এ কারণেই বর্তমান সরকার রাষ্ট্র পরিচালনার প্রথম সপ্তাহ থেকেই নির্বাচনী ইশতেহার এবং জুলাই সনদের প্রতিটি দফা পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়নের দিকে মনোযোগ দিয়েছে।’
‘সারা দেশে বিভিন্ন পর্যায়ের আদালতগুলোতে দেওয়ানি ও ফৌজদারি—সব মিলিয়ে খুব সম্ভবত ৪৭ লাখেরও বেশি মামলা বিচারাধীন রয়েছে। এর মধ্যে জমি-জমা সংক্রান্ত মামলার সংখ্যাই বেশি। সুতরাং, এই মুহূর্তে সরকারের সামনে প্রধান অগ্রাধিকার হচ্ছে, আদালতে বিচারাধীন মামলার দ্রুততম নিষ্পত্তি। তবে প্রচলিত আদালতের বাইরেও জমি-জমা সংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য গ্রাম আদালত কিংবা বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তির (এডিআর) মতো আইনানুগ ব্যবস্থা অবলম্বনের দিকেও জোর দেওয়া জরুরি বলে আমরা মনে করি। এতে একদিকে বিরোধ নিষ্পত্তিতে যেমন অল্প সময় লাগবে, অপরদিকে অনেক ক্ষেত্রেই বিরোধ হয়তো শত্রুতায় রূপ নেবে না।’
তারেক রহমান বলেন, ‘বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে আলবার্ট আইনস্টাইনের একটি তাৎপর্যপূর্ণ উক্তির কথা আপনাদের সামনে আমি তুলে ধরতে চাই। তিনি বলেছিলেন, পিস কান্ট বি কেপ্ট বাই ফোর্স, ইট ক্যান অনলি অ্যাচিভড বাই আন্ডারস্ট্যান্ডিং। বিশেষ করে জমিজমা সংক্রান্ত মামলা বা দেওয়ানি মামলাগুলো পর্যায়ক্রমে নেগোসিয়েশন বা আলোচনা, মধ্যস্থতা বা সালিশ কিংবা সমঝোতার মাধ্যমে বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তির পথ কার্যকর করা গেলে একদিকে আদালতে বিচারাধীন মামলার জট কমবে। অপরদিকে দ্রুততম সময়ের মধ্যে জমি-জমা সংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তি করাও সহজ হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘জমি বা ভূমি শুধু এক টুকরো সম্পদই নয়। বরং মানুষের জীবনে এটি এক ধরনের নিরাপত্তা, নির্ভরতা, অর্থনৈতিক স্থিতি, জীবিকা এবং ভবিষ্যতের ভিত্তি—এই উপলব্ধি থেকেই জমি ব্যবস্থাপনাকে হয়রানি ও দুর্নীতি করার অঙ্গীকার নিয়ে জনগণের দোরগোড়ায় রাষ্ট্রীয় সেবা পৌঁছে দিতে বর্তমান সরকার কাজ করছে।’
ভূমি মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট সব কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘সেবা প্রদান জনগণের প্রতি করুণা নয়, বরং সেবা নিশ্চিত করা আমাদের দায়িত্ব বলেই আমি মনে করি।’
তিনি আরও বলেন, কৃষি জমির অপব্যবহার সম্পর্কে আমাদেরকে অবশ্যই সতর্ক থাকতে হবে। কৃষি-অকৃষি জমি কিংবা এক ফসলি, দুই ফসলি বা তিন ফসলি জমির ব্যবহার এবং ব্যবস্থাপনা নিয়ে পরবর্তীতে আলাপ-আলোচনা করবেন বলেও জানান প্রধানমন্ত্রী।
আমার বার্তা/এমই

