
রাস্তায় অটোরিকশা এখন আর শুধু একটি যানবাহন নয়; এটি লাখো মানুষের জীবিকার শেষ আশ্রয়। অথচ এই বাস্তবতার ভেতরেই জমে উঠেছে আরেকটি জটিল সংকট; অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগ, বিশৃঙ্খল চলাচল, এবং নিয়ন্ত্রণহীন নগর পরিবহন। এরই মধ্যে কেউ কেউ কঠোর সমাধানের কথা বলছেন; গ্যারেজের বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দিলে অটোরিকশা নিজে থেকেই বন্ধ হয়ে যাবে। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়; এটি কি সত্যিকার সমাধান, নাকি নতুন সংকটের সূচনা?
কঠোরতা দ্রুত ফল দিতে পারে; তবে সব ফল কল্যাণকর হয় না। বিদ্যুৎ লাইন কেটে দিলে হয়তো অটোরিকশা থামবে; কিন্তু চালকের সংসার কি থেমে থাকবে? যে মানুষটি দিনভর রাস্তায় সংগ্রাম করে সন্ধ্যায় পরিবারের মুখে আহার তুলে দেয়; তার জন্য এই সিদ্ধান্ত কেবল প্রশাসনিক পদক্ষেপ নয়, এটি জীবনের ওপর সরাসরি আঘাত। তখনই প্রবাদটি নির্মম সত্য হয়ে ওঠে; পাটা পুতার ঘষাঘষিতে মরিচের প্রাণ যায়। ক্ষমতার দ্বন্দ্বে পিষ্ট হয় সাধারণ মানুষ।
বাস্তবতা হলো; সমস্যা অটোরিকশা নয়, সমস্যা তার অব্যবস্থাপনা। অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগ যেমন অপরাধ; তেমনি বিকল্প না দিয়ে তা বন্ধ করাও নীতিগত ব্যর্থতা। কারণ শূন্যস্থান কখনো শূন্য থাকে না; বৈধ পথ অনুপস্থিত হলে মানুষ অবৈধ পথেই প্রবাহিত হয়। তাই সমাধান হতে হবে এমন; যা শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করবে, আবার জীবিকার নিরাপত্তাও নিশ্চিত করবে।
প্রথমত; সব অটোরিকশাকে নিবন্ধনের আওতায় আনতে হবে। একটি ইউনিক নম্বর, একটি সমন্বিত ডিজিটাল ডাটাবেস, এবং নির্দিষ্ট রুটভিত্তিক চলাচল; এই তিনটি উদ্যোগ বিশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে কার্যকর হতে পারে। এতে বৈধতা ও অবৈধতার বিভ্রান্তি দূর হবে; প্রশাসনিক নজরদারিও হবে সহজ ও স্বচ্ছ।
দ্বিতীয়ত; অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগ বন্ধের আগে বৈধ বিকল্প নিশ্চিত করতে হবে। সিটি করপোরেশনের তত্ত্বাবধানে নির্দিষ্ট চার্জিং স্টেশন স্থাপন করা যেতে পারে; যেখানে প্রিপেইড মিটারের মাধ্যমে নির্ধারিত মূল্যে চার্জ দেওয়া সম্ভব। এতে বিদ্যুৎ চুরি কমবে; পাশাপাশি সরকার রাজস্ব অর্জনের নতুন ক্ষেত্র পাবে। অর্থাৎ বর্তমানের সংকটই ভবিষ্যতের সম্পদে রূপ নিতে পারে।
তৃতীয়ত; অটোরিকশায় সোলার প্রযুক্তির ব্যবহার সময়োপযোগী চিন্তা। তবে এর সীমাবদ্ধতা স্বীকার করাও জরুরি; একটি ক্ষুদ্র প্যানেল দিয়ে সম্পূর্ণ শক্তি সরবরাহ সম্ভব নয়। কিন্তু এটি সহায়ক শক্তি হিসেবে কার্যকর হতে পারে; ফলে একটি সমন্বিত ব্যবস্থা গড়ে তোলা যায়, যেখানে দিনে সোলারের সহায়তা থাকবে, আর প্রয়োজন অনুযায়ী চার্জিং অবকাঠামো ব্যবহৃত হবে।
চতুর্থত; পরিবহন ব্যবস্থাকে সিটি করপোরেশন বা পৌরসভার আওতায় এনে রুটভিত্তিক লাইসেন্স প্রদান করা প্রয়োজন। এতে ভাড়া নির্ধারণ, যাত্রী নিরাপত্তা, এবং যানবাহনের সংখ্যা একটি কাঠামোর মধ্যে আসবে; অটোরিকশা তখন আর অনিয়ন্ত্রিত সমস্যা নয়, বরং স্বীকৃত নগর পরিবহনের অংশ হয়ে উঠবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো মানবিকতা; কোনো পরিবর্তনই হঠাৎ চাপিয়ে দেওয়া উচিত নয়। ধাপে ধাপে রূপান্তর, চালকদের প্রশিক্ষণ, এবং বিকল্প আয়ের সুযোগ সৃষ্টি; এই তিনটি উপাদান নিশ্চিত না করলে কোনো নীতিই কার্যকর হবে না। রাষ্ট্রের দায়িত্ব কেবল আইন প্রয়োগ নয়; দিকনির্দেশনা প্রদানও সমান গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের মনে রাখতে হবে; অটোরিকশা নিজে অবৈধ নয়, অবৈধ তার ব্যবস্থাপনা। তাই সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে সমস্যার সমাধান হয় না; বরং তা আরও গভীর হয়। সমাধান নিহিত একটি সুষম দৃষ্টিভঙ্গিতে; যেখানে শৃঙ্খলা, প্রযুক্তি, এবং মানবিকতা একসাথে কাজ করে।
শেষ কথা; ধ্বংস করা সহজ, গড়ে তোলা কঠিন। রাষ্ট্র যদি ধ্বংসের পথ বেছে নেয়; মানুষ দিক হারায়। আর রাষ্ট্র যদি দিকনির্দেশনা দেয়; মানুষই হয়ে ওঠে শক্তি। এই শক্তিকে সংগঠিত করাই এখন সময়ের অপরিহার্য দাবি।
আমার বার্তা/এমই

