শিরোনাম :

  • আজ পিকেএসএফ উন্নয়ন মেলার উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী টস জিতে ব্যাটিংয়ে বাংলাদেশ যে চ্যানেলে দেখা যাবে বাংলাদেশ-ভারত টেস্ট ম্যাচ সৌদি অ্যারামকোতে প্রথমবারের মতো নারী প্রধান ইসরায়েলি হামলায় গাজায় রক্তবন্যা, ২৪ ফিলিস্তিনি নিহত
পাবনায় মাদকের পথ থেকে ফেরা একজন সাজ্জাদের গল্প
পাবনা প্রতিনিধি :
০৫ নভেম্বর, ২০১৯ ১৩:২৫:৫৭
প্রিন্টঅ-অ+


মাদকে যেন গ্রাস করেছিল তাকে। সাথে উচ্ছৃঙ্খলতাও হয়ে উঠেছিল তার জীবনের অনুসঙ্গ। এভাবে এক নষ্ট জীবনে প্রবেশ করেছিলেন তিনি।

বন্ধুদের পাল্লায় পড়ে মাদক সেবনে তার হাতে খড়ি। এরপর আড্ডাবাজি আর মারামারিতেই কাটছিল সময়। এইচএসসি পাশ করার পর বেকারত্বের কারণে তার এই অধঃপতন। জীবন হয়ে ওঠে হতাশা ভরা। ধ্বংস হতে বসে তার ভবিষ্যত। ছেলের এমন অবস্থায় নিরুপায় বাবা হাতে ৯০ হাজার টাকা দিয়ে বের করে দেন বাড়ি থেকে।

না, এরপর তিনি নষ্ট করে দেননি সে টাকা। নতুন বোধোদয় জন্মে তার। নিজের ভুল বুঝতে পেরে ছেড়ে দেন মাদকের পথ। শুরু করেন ফার্নিচার তৈরী ও ব্যবসা। সেখান থেকেই শুরু।

এরপরের টুকু শুধুই এগিয়ে যাওয়ার গল্প। মেধা, শ্রম আর ধৈর্য্য দিয়ে মাত্র ৫ বছরেই সফল উদ্যোক্তা সাজ্জাদ। তার কারখানায় কাজ করে স্বাবলম্বী হয়েছেন ২২ জন শ্রমিক। যাদের অনেককেই মাদকের পথ থেকে ফিরিয়ে এনেছেন সাজ্জাদ। সব খরচ বাদ দিয়ে প্রতি মাসে তার বর্তমানে আয় লাখ টাকার উপরে।

ঘুরে দাঁড়ানোর অনন্য উদাহরণের এই গল্পের চরিত্রের পুরো নাম সাজ্জাদ খান। পাবনার চাটমোহর পৌর সদরের নারিকেলপাড়া মহল্লার মো: নিয়াজ খানের ছেলে।

আলাপকালে সাজ্জাদ খান জানান, ১৯৯৯ সালে এসএসসি পাশ করে চাটমোহর ডিগ্রি কলেজে ভর্তি হন। ২০০১ সালে দ্বিতীয় বিভাগ পেয়ে এইচএসসি পাশ করেন। কোনো চাকরি বা কাজ না পেয়ে প্রথমে সিগারেট খাওয়া শুরু। এরপর বন্ধু-বান্ধবদের পাল্লায় পড়ে মাদকে আসক্তি। জড়িয়ে পড়েন অপরাজনীতির সাথেও। ছেলের নেশায় আসক্তির বিষয়টি বুঝতে পেরে পরিবারের লোকজন ঢাকায় এক নিকট আত্মীয়ের কাছে পাঠিয়ে দেন। সেখানে একটি বে-সরকারি সংস্থায় সেলসম্যান হিসেবে চাকরি নেন তিনি। এর মধ্যে কিডনির অসুখ ধরা পড়ে সাজ্জাদের। পরে ভারতে গিয়ে চিকিৎসা করে একটি কিডনী শরীর থেকে ফেলে দিতে হয় তার।

এরপর বেকার হয়ে পড়ায় হতাশা ঘিরে ধরলে আবারও নেশায় জড়িয়ে পড়েন। এরমধ্যে থানা পুলিশের হাতে ধরা খেয়ে মাদক মামলায়ও পড়তে হয় তাকে। পরে জামিনে বেরিয়ে আসার পর ৯০ হাজার টাকা হাতে ধরিয়ে দিয়ে সাজ্জাদকে বাড়ি থেকে বের করে দেন তার বাবা। এরপরেই শুরু হয় সাজ্জাদের নতুন জীবন। পৌর শহরেই একটি বাসা ভাড়া নিয়ে স্ত্রী ও সন্তানদের নিয়ে বসবাস শুরু করেন। অভাব-অনটন দেখা দেয় সংসারে।

ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টায় বিভোর সাজ্জাদ কোন অভিজ্ঞতা ছাড়াই একজন শ্রমিক ও নিজে শ্রম দিয়ে লেকার বোর্ড দিয়ে শুরু করেন ফার্নিচার তৈরির কাজ। এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি সাজ্জাদকে। ২০১৫ সালে ‘খান ফার্নিচার’ নামে একটি শো-রুম খুলে বসেন। বাড়তে থাকে ব্যবসার পরিধি। শো-রুমের পাশেই একটি কারখানা তৈরি করেন। আর এভাবেই মাত্র পাঁচ বছরের মধ্যে নিজেকে সফল উদ্যোক্তা হিসেবে দাঁড় করিয়েছেন তিনি।

মাত্র নব্বই হাজার টাকা থেকে এখন তার পুঁজি ৪৫ লাখ টাকারও অধিক। তার কারখানায় কর্মসংস্থান হয়েছে ২২ তরুণ শ্রমিকের। মাঠে কিনেছেন ১৬ শতক জমি। সংসারেও ফিরেছে শান্তি।

সাজ্জাদ খান বলেন, ‘মাদকে জড়িয়ে পড়ার কারণে জীবন থেকে সোনালী সময়গুলো হারিয়ে গেছে। অনেক কিছুই হারিয়েছি। একসময় সবাই আমাকে বাঁকা চোখে দেখতো। এখন সবাই ভালোবাসে। আমি চাইলেও সেই সময়গুলো আর ফিরে পাবো না। মাদক জীবন ভয়ঙ্কর জীবন। নিজের জীবন থেকে শিক্ষা নিয়ে তাই সমাজের অবহেলিত ও মাদকের সাথে জড়িত কিছু ছেলেকে তুলে এনে আমার কারখানায় কাজ দিয়েছি। এখন তারা মাসে ১০-১৫ হাজার টাকা বেতন পায়।

তার কারখানায় কাজ করা শ্রমিক ইমরান হোসেন, গাফফার হোসেন জানান, তারা এক সময়ে মাদকের সাথে জড়িয়ে পড়েছিল। বাড়িতে ছিল অশান্তি। কেউ দেখতে পারতো না। সাজ্জাদ তাদের ডেকে তার কারখানায় কাজ দিয়েছে। এখন তারা প্রতি মাসে ভাল বেতন পায়। বাবা-মায়ের মুখে খাবার তুলে দিতে পারেন। বছরে দু’খানা কাপড় দিতে পারেন। খারাপ পথ থেকে ফিরে তারা সমাজের চোখেও ভাল ছেলে হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে।

এ বিষয়ে বাবা নিয়াজ খান বলেন, ‘আমার একমাত্র ছেলে সাজ্জাদ। এক সময় ছেলেকে নিয়ে অনেক অশান্তি ভোগ করেছি। মাদক সেবনের কারণে তার একটি কিডনি নষ্ট হয়। ‘ও’ ভুল পথ থেকে ফিরে আসায় আমরা পরিবারের সবাই খুব খুশি।’



সাজ্জাদের ব্যাপারে স্থানীয় ওয়ার্ড কাউন্সিলর ও প্যানেল মেয়র নাজিম উদ্দিন মিয়া বলেন, ‘সাজ্জাদ একসময় মাদক সেবন করতো। যাকে তাকে মারধর করতো। জীবনে অনেক কিছু হারিয়ে সে এখন অনেক বড় ব্যবসায়ী। আসলে ইচ্ছা থাকলে মানুষ ঘুরে দাঁড়াতে পারে তার জ্বলন্ত উদাহারণ সাজ্জাদ’।



আমার বার্তা/০৫ নভেম্বর ২০১৯/রহিমা


আরো পড়ুন