শিরোনাম :

  • নয়াপল্টনে বিএনপির নেতাকর্মীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ জবানবন্দিতে বুলুসহ ১৫ বিএনপি নেতার নাম পেয়েছে পুলিশ সেনা অভ্যুত্থানবিরোধী বিক্ষোভে উত্তাল সুদান, সংঘর্ষে নিহত ৭দুই ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষ, নিহত ২
ডিএসসিসির একাল-সেকাল পর্ব-২
বহাল তবিয়তে তিন খলিফার নেতৃত্বাধীন সেই সিন্ডিকেট
হাসান মাহমুদ রিপন
০৭ নভেম্বর, ২০২১ ২১:৪৬:২৯
প্রিন্টঅ-অ+


ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের (ডিএসসিসি) বর্তমান মেয়রের দায়িত্ব গ্রহণের পূর্বে প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই চলেছে সীমাহীন অনিয়ম আর দুর্নীতি। তৎকালীন দায়িত্ব পেয়েই অনিয়ম-দুর্নীতিতে জড়িয়ে অনেকে হয়েছেন কোটি কোটি টাকার মালিক। তবে বর্তমান সময়ে ডিএসসিসি যে সম্পূর্ণ দুর্নীতিমুক্ত এমনটা ভাবারও কোনো অবকাশ নেই। তবে বর্তমান মেয়র ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপস দায়িত্ব গ্রহণের পরই ঘোষণা দিয়েছেন দুর্নীতির বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতা নীতির। ডিএসসিসিতে বিগত মেয়রের সময়ে ও বর্তমান মেয়রের আমলে চলমান ঘটনা নিয়ে ধারাবাহিক প্রতিবেদনের আজ প্রকাশিত হলো দ্বিতীয় পর্ব।

অভিযোগ রয়েছে, বর্তমানে নগর ভবনসহ ডিএসসিসির সব অঞ্চলেই রয়েছে বিগত মেয়রের আমলে গড়ে ওঠা তিন খলিফার নেতৃত্বাধীন শক্তিশালী ঐ সিন্ডিকেটের সদস্য। পরিবর্তন হয়েছে শুধু সিন্ডিকেটের নেতৃত্বের। বিগত মেয়রের আমলে এ সিন্ডিকেটের নেতৃত্ব দিতেন কথিত তিন খলিফা আর বর্তমান সময়ে এর নেতৃত্ব ভাণ্ডার বিভাগের একজনের মাধ্যমে সংস্থার ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা দিচ্ছেন বলে জানা গেছে। আর এর মাধ্যমে প্রশাসনিক অনিয়ম ও দায়িত্ব পালনে আইনবহিভূত কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে করছে কোটি কোটি টাকা অর্থ আত্মসাৎ। শীর্ষ কর্তাব্যক্তিদের পছন্দের কর্মকর্তাদের সুবিধা দিতে ডিএসসিসিতে হরহামেশাই এ ধরনের ঘটনা ঘটছে বলেও অভিযোগে প্রকাশ। এমনকি নানা ফন্দিফিকিরের মাধ্যমে ডিএসসিসির বর্তমান মেয়রের আমলে গত ডিসেম্বর মাসে কর এবং উপকর কর্মকর্তা পদে দেয়া পদোন্নতির তালিকার বড় অংশটিই দখল করে নিয়েছে এ চক্রটি। সূত্র মতে, বিগত মেয়রের আমলে ডিএসসিসিতে গড়ে ওঠা ওই সিন্ডিকেট তাদের প্রতিপক্ষকে ঘায়েলে ভিন্ন কৌশল অবলম্বন করছে। সিন্ডিকেটের সদস্যরা তিনটি ভাগে বিভক্ত হয়ে প্রতিপক্ষ ঘায়েলে কাজ করছে। প্রতিপক্ষ যাকে টার্গেট করবে প্রথম পক্ষ তার বিরুদ্ধে অভিযোগ দাঁড় করাবে, দ্বিতীয় পক্ষ তার সমর্থনে যুক্তিযুক্ত সাক্ষী প্রদান করবেন এবং তৃতীয় পক্ষ যিনি অভিযোগটি সুকৌশলে মেয়র সেল অথবা সুযোগ হলে সরাসরি মেয়রের কাছে পৌঁছে দেবেন।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে রাজস্ব বিভাগের এক কর্মকর্তা জানান, ডিএসসিসি সাবেক মেয়র মোহাম্মদ সাঈদ খোকনের সরাসরি পৃষ্ঠপোষকতা পাওয়ায় সিন্ডিকেটের সদস্যরা সাধারণ কর্মকর্তাদের ওপর হয়রানি-নির্যাতনের এক ধরনের স্টিমরোলার চালিয়েছেন। এসব নির্যাতিতের মধ্যে অন্যতম হচ্ছেন তৎকালীন নির্বাহী প্রকৌশলী (বিদ্যুৎ) নূর মোহাম্মদ, ভাণ্ডার কর্মকর্তা লিয়াকত আলী, সিনিয়র কর কর্মকর্তা আতাহার আলী খান, অঞ্চল-৪ এর রাজস্ব বিভাগের হিসাব সহকারী মো. মঈনুদ্দিন বেপারী, রেভিনিউ সুপারভাইজার মো. তৌহিদ হোসেন, অঞ্চল-৩ এর লাইসেন্স সুপারভাইজার শেখর চন্দ্র রায়, পরিবহন বিভাগের মহাব্যবস্থাপকের পিএ মো. ফারুক হোসেন, বাজার শাখা-৩ এর রেন্ট অ্যাসিস্ট্যান্ট মো. নাসির উদ্দিনসহ আরো অনেকে। তবে এসবের মধ্যে আবার নির্বাহী প্রকৌশলী (বিদ্যুৎ) নূর মোহাম্মদ এবং সিনিয়র কর কর্মকর্তা আতাহার আলী খানের হয়রানি প্রায় সবারই বিবেকে নাড়া দিয়েছে। নির্বাহী প্রকৌশলী (বিদ্যুৎ) নূর মোহাম্মদ নিম্নমানের এলইডি বাতি ক্রয়ে প্রতিবন্ধকতা করায় তাকে বরখাস্ত করা হয়েছিল বলে জানা গেছে। যেহেতু তিনি তৎকালীন মেয়র মোহাম্মদ সাঈদ খোকনের বাল্যকালে গৃহশিক্ষক ছিলেন, তাই মেয়রের মাকে ধরে দীর্ঘদিন শাস্তি ভোগের পর রক্ষা পান বলে জানা গেছে।

অন্যদিকে রাজস্ব বিভাগের সিনিয়র কর কর্মকর্তা আতাহার আলী খান কর আদায়ে সিন্ডিকেটের অনৈতিক কাজে সহায়তা না করায় ডিএসসিসির সাবেক প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তার (সিআরও) রোষানলে পড়েন। আর তাই সাবেক সিআরও তার আস্থাভাজনদের পদোন্নতি দিতে আতাহার আলীর শিক্ষাগত সনদপত্র জাল আখ্যা দিয়ে এক ব্যক্তিকে দিয়ে আদালতে মামলা করান। আর এ মামলায় সাবেক সিআরওসহ সিন্ডিকেটের লোকজন কর্পোরেশনের কর্মচারীকে বাদী হতে বাধ্য করে। মামলার ওই বাদী এখন তা অকপটে স্বীকার করছেন। এমনকি কর্পোরেশনের নিজস্ব আইনজীবীর কাছেও বিষয়টি বানোয়াট বলে জানান মামলার বাদীরা। যদিও এসব মামলা ইতোমধ্যেই বানোয়াট হিসেবে প্রমাণ হয়েছে। তবে মামলার শুরুতেই আতাহার আলীকে বরখাস্ত করা হলেও আদালত তাকে যোগদানের আদেশ দিলে প্রথমে কর্তৃপক্ষ গড়িমসি এবং পরবর্তীতে যোগদান করিয়ে তার দপ্তরে না দিয়ে নগর পরিকল্পনা বিভাগে তাকে সংযুক্ত করে রাখা হয়। এরই মধ্যে আতাহার আলীর চাকরি জীবন থেকে নষ্ট হয় প্রায় ১০ বছর। সাবেক সাঈদ খোকনের আমলে এত নির্যাতনের পর আবারো বর্তমান মেয়রের আমলে ওই সিন্ডিকেট টার্গেট করে আতাহার আলীকে। কারণ তিনি বর্তমান মেয়রের কাছে তাদের সব অনিয়ম-দুর্নীতি ফাঁস করে দিতে পারেন। আর এ আতঙ্ক থেকেই সিন্ডিকেট সদস্যরা আতাহার আলীর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র শুরু করেন। বিশেষ করে রাজস্ব বিভাগের দুই কর্মকর্তা এ বিষয়ে অনেক কাঠখড় পুড়িয়েছেন। যার খেসারত দিতে হয়েছে তার চাকরি হারিয়ে।

ডিএসসিসির সাবেক কর কর্মকর্তা মো. আতাহার আলী এ বিষয়ে বলেন, ‘সাবেক মেয়র সাঈদ খোকনের আমলে যাদের রোষানলে পড়ে আমাকে দীর্ঘদিন হেনস্তা ও হয়রানি হতে হয়েছে, তারাই তাদের আতঙ্ক থেকে আমার বিরুদ্ধে নানা অপপ্রচার করেছে। এই চক্র কখনো আমার সনদপত্র নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে আবার কখনো আমাকে বিএনপির প্রয়াত মহাসচিব মান্নান ভূইয়ার এপিএস হিসেবে আখ্যা দিয়ে নানা অপপ্রচার করেছে। তারই ধারাবাহিকতায় বর্তমান মেয়রের আমলেও চক্রটি আমাকে হেনস্তার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত।’ জানা গেছে, ডিএসসিসির রাজস্ব বিভাগ, প্রশাসন দপ্তর, হিসাব বিভাগ, আইন বিভাগ, ভাণ্ডার ও ক্রয় বিভাগ, সম্পত্তি বিভাগসহ বিভিন্ন দপ্তরে বিগত মেয়রের আমলে গড়ে ওঠা সিন্ডিকেট সদস্যরা ছড়িয়ে রয়েছেন। আর তারা বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করে ইতোমধ্যেই স্ব স্ব দপ্তরে শক্ত অবস্থান গড়ে তুলেছেন। এ অবস্থান তৈরিতে তারা বিভিন্ন সময় বর্তমান মেয়রের বিশ^স্ত অথবা কাছের লোকদের ব্যবহার কিংবা ভাণ্ডার বিভাগের একজনকে ব্যবহার করে সংস্থার ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা দিয়ে তারা সুবিধাজনক অবস্থান পৌঁছে গেছেন।

সূত্রে মতে, বর্তমান মেয়রের আমলে ২০২০ সালের ডিসেম্বরে কর কর্মকর্তা ও উপকর কর্মকর্তা পদে দেয়া পদোন্নতিতেও এ সিন্ডিকেটের সদস্যরাই বিভিন্ন কৌশলে বড় একটি অংশ দখল করে নিয়েছেন, যা নিয়ে বিগত মেয়রের আমলে বঞ্চিত এবং সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে চাপা ক্ষোভ বিরাজ করছে। সূত্র মতে, ডিএসসিসি প্রধান কার্যালয়ের তিন খলিফাখ্যাত নেতৃত্বাধীন এ সিন্ডিকেটের তৎকালীন বিশ্বস্ত এবং অন্যতম ছিলেন রাজস্ব বিভাগের ৬, মেয়র সেলের ১, প্রকৌশল বিভাগের ৩, হিসাবরক্ষণ বিভাগের ৩, প্রণিক দপ্তরের ১, স্বাস্থ্য বিভাগের ২, পরিবহন বিভাগের ২, সম্পত্তি বিভাগে ২ এবং আইন বিভাগে ৩ জনসহ আঞ্চলিক কার্যালয়ে আরো অনেকেই এ সিন্ডিকেটের নেতৃত্বে কাজ করেছেন বলে জানা গেছে। তাছাড়া সিন্ডিকেটের সদস্য রয়েছেন অনেকেই। তারা সংস্থাকে রাজস্ব আয়বঞ্চিত করে নিজেরা হয়েছেন কোটি কোটি টাকার মালিক।

 


আরো পড়ুন