
নির্বাচন পরিচালনার মূল দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের। এই দায়িত্বে কমিশন নিরপেক্ষ না থাকলে নির্বাচন সুষ্ঠু হবে না বলে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) ও সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজনের সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে সরকারের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে, নির্বাচন কমিশনকে শতভাগ নিরপেক্ষতা বজায় রেখে সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজনের জন্য সহায়তা করতে।
শনিবার (২৪ জানুয়ারি) ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সাগর-রুনি মিলনায়তনে “সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিতকরণে অংশীজনের ভূমিকা” শীর্ষক সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। অনুষ্ঠানে সুজনের প্রধান নির্বাহী বদিউল আলম মজুমদার বক্তব্য রাখেন। সংবাদ সম্মেলনে সুজনের কেন্দ্রীয় সমন্বয়কারী দিলীপ কুমার সরকার লিখিত বক্তব্য তুলে ধরেন।
বদিউল আলম মজুমদার বলেন, গণতন্ত্র মানে সবার সমান সুযোগ ও সহিষ্ণুতা। কিন্তু বর্তমানে বিভিন্ন পক্ষ অন্য পক্ষকে সেই সুযোগ দিতে চাচ্ছে না। অনেক জায়গায় দেখা যাচ্ছে—একটি দল বা প্রার্থী থাকলে অন্যরা নির্বাচনে অংশগ্রহণ থেকে বিরত থাকছে। এটি গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের লঙ্ঘন। তিনি বলেন, রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীদের এমন মনোভাব পরিহার করতে হবে। কারণ অসহিষ্ণুতা থেকেই সহিংসতা সৃষ্টি হয়। ইতোমধ্যে ডিম ছোড়া, ময়লা পানি ফেলা ও সহিংসতার মতো ঘটনা ঘটছে। যদি এসব বন্ধ না হয় এবং নির্বাচন কমিশন ও সরকার কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ না নেয়, তাহলে পরিস্থিতি দ্রুত বেসামাল পর্যায়ে চলে যাবে।
তিনি আরও বলেন, টাকার প্রভাব নির্বাচনকে প্রভাবিত করছে। এ পরিস্থিতি মোকাবেলায় সুজন আগে থেকেই নির্বাচন কমিশন সংস্কারের পক্ষ থেকে সুপারিশ করেছিল—প্রার্থীদের ব্যয় নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা। কিন্তু কমিশন এই প্রস্তাব উপেক্ষা করছে। বিশেষত ঋণ খেলাপি ও দ্বৈত নাগরিকদের প্রার্থী হওয়ার ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশন যে নমনীয়তা দেখিয়েছে, তা গ্রহণযোগ্য নয়। তিনি বলেন, নির্বাচন কমিশনের একজন সদস্যের বক্তব্য ছিল—‘মনোনয়ন বৈধ করলাম, ব্যাংকের টাকাটা দিয়ে দিন’। এটি স্পষ্ট ঋণ খেলাপির প্রমাণ। একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান থেকে এমন আচরণ গ্রহণযোগ্য নয়। নির্বাচন কমিশনকে এই বিষয়ে প্রশ্ন করতে হবে—এ ধরনের আচরণ তারা ভবিষ্যতেও করবে কি না। যদি ভবিষ্যতেও এমন আচরণ চলতে থাকে, তাহলে নির্বাচন বিতর্কিত হবে।
তিনি বলেন, পোস্টার ব্যালটের বিষয়টি পুরো নির্বাচন ব্যবস্থাকে ও ফলাফলকে বিতর্কিত করতে পারে। তাই নির্বাচন কমিশনকে সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে বিষয়টি সমাধান করতে হবে। এছাড়া এআই যুগে অপতথ্য ও বিভ্রান্তিকর প্রচারণা বৃদ্ধি পাবে—যেমন জীবিতকে মৃত বা মৃতকে জীবিত দেখানো। এই ধরনের প্রচারণা নির্বাচনে প্রভাব ফেলতে পারে, তাই কমিশনকে এ বিষয়ে সজাগ ও তৎপর থাকতে হবে।
সংবাদ সম্মেলনের লিখিত বক্তব্যে বলা হয়েছে, নির্বাচন পরিচালনার মূল দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের। কিন্তু কমিশন নিরপেক্ষ না হলে নির্বাচন সুষ্ঠু হবে না। ইতোমধ্যে ঋণখেলাপি ও দ্বৈত নাগরিকদের প্রার্থী হওয়ার ক্ষেত্রে কমিশনের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে। প্রার্থীদের বার্ষিক আয় ও সম্পদ সংক্রান্ত তথ্য দেখে জনমনে ধারণা তৈরি হয়েছে—অনেকে তথ্য গোপন করেছেন। এ ক্ষেত্রে প্রশ্ন করা হয়েছে, নির্বাচন কমিশন কি হলফনামা তথ্য যথাযথভাবে যাচাই করেছে? প্রভাবশালী প্রার্থীদের ক্ষেত্রে কমিশন কি নমনীয় ছিল? এসব অভিযোগের মধ্যে সামান্যতম সত্যতা থাকলেও নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ হবে।
সুজনের আহ্বানে নির্বাচন কমিশনের প্রতি বলা হয়েছে, শতভাগ নিরপেক্ষ অবস্থান থেকে নির্বাচন পরিচালনা করুন, অবাধ, নিরপেক্ষ ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের পরিবেশ নিশ্চিত করতে যথাযথ পদক্ষেপ নিন, সব দল ও প্রার্থীর জন্য লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত করুন এবং নির্বাচনী আচরণবিধি মেনে চলার বিষয়ে কঠোরতা দেখান। কালো টাকা ও পেশিশক্তির প্রভাবমুক্ত নির্বাচন নিশ্চিত করুন এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীসহ নির্বাচনী দায়িত্বে নিয়োজিতদের নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করুন। কেউ নিরপেক্ষতা ভঙ্গ করলে তাৎক্ষণিক কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করুন। কোনো কেন্দ্রে ব্যাপক অনিয়ম হলে নির্বাচন স্থগিত বা ফলাফল বাতিলের নির্দেশ দিন।
সরকারের প্রতি সুজনের আহ্বান ছিল, নির্বাচনকালীন সরকার হিসেবে শতভাগ নিরপেক্ষতা বজায় রাখুন, নির্বাচন কমিশনকে সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজনের জন্য সহায়তা করুন, নির্বাচনী এলাকায় আইনশৃঙ্খলা ও মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করুন এবং সবাইকে বার্তা দিন—সরকার সুষ্ঠু নির্বাচন চায় এবং অনিয়ম করলে কঠোর শাস্তি হবে।
রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি সুজনের আহ্বান ছিল, নির্বাচনী আচরণবিধি মেনে চলুন, যে কোনো মূল্যে বিজয়ী হওয়ার মনোভাব পরিত্যাগ করুন, নির্বাচনকে প্রতিযোগিতা হিসেবে গ্রহণ করুন এবং ফলাফল যাই হোক শান্তভাবে মেনে নিন। প্রার্থীদের প্রভাবিত করা ও দ্বন্দ্ব-হানাহানি থেকে বিরত থাকুন।
আমার বার্তা/এমই

