
জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাতে ক্রমেই তীব্র হচ্ছে তাপপ্রবাহ। এই বাস্তবতায় দেশের সবকটি নগর কেন্দ্রকে একটি সমন্বিত ও বিজ্ঞানভিত্তিক অভিযোজন পরিকল্পনার আওতায় আনার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. রেজাউল মাকসুদ জাহেদী জানিয়েছেন, দেশের ৫৩২টি নগর কেন্দ্রকে কেন্দ্র করে জলবায়ু ও হিটওয়েভ মোকাবিলায় একটি কার্যকর মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হবে। একাডেমিক গবেষণার ফল সরাসরি মাঠপর্যায়ে প্রয়োগে সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ বলেও জানান তিনি।
সোমবার (২৬ জানুয়ারি) সকালে রাজধানীর তেজগাঁওয়ে হলিডে ইন হোটেলে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে ক্রমবর্ধমান তাপপ্রবাহ ও এর স্বাস্থ্যঝুঁকি মোকাবিলায় বাংলাদেশে ‘হিট-হেলথ অ্যাডাপটেশন প্ল্যান’ প্রণয়ন বিষয়ে এক কর্মশালায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে এ কথা বলেন স্থানীয় সরকার সচিব।
বৈশ্বিক জলবায়ু পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থানের কথা তুলে ধরে মো. রেজাউল মাকসুদ জাহেদী বলেন, ‘গ্লোবাল ক্লাইমেট ইনডেক্স ২০২৩’ অনুযায়ী জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর তালিকায় বাংলাদেশ নবম স্থানে রয়েছে। অথচ বৈশ্বিক কার্বন নিঃসরণে বাংলাদেশের অবদান মাত্র শূন্য দশমিক ৩৫ শতাংশ।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ কোনো বড় কার্বন নিঃসরণকারী দেশ নয়, বরং জলবায়ু পরিবর্তনের ভুক্তভোগী। এই বাস্তবতা থেকেই দেশের নিজস্ব সক্ষমতা বাড়ানো এবং দীর্ঘমেয়াদি অভিযোজন পরিকল্পনা গ্রহণ করা জরুরি হয়ে পড়েছে।
৫৩২টি নগর কেন্দ্র ও বাজেট বরাদ্দ
সচিব জানান, দেশে বর্তমানে ১২টি সিটি কর্পোরেশন, ৩৩০টি পৌরসভা এবং উপজেলা ও জেলা সদর মিলিয়ে মোট ৫৩২টি নগর কেন্দ্র রয়েছে। আগে স্থানীয় সরকার বিভাগের কার্যক্রমে জলবায়ু পরিবর্তন বা হিট অ্যাডাপ্টেশন সরাসরি অন্তর্ভুক্ত ছিল না। এখন সেটিকে অগ্রাধিকার দিয়ে মূল পরিকল্পনায় যুক্ত করা হচ্ছে।
তিনি জানান, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা চিহ্নিত করতে সরকার একটি ‘ভালনারেবিলিটি ইনডেক্স’ তৈরি করেছে। ফিজিক্যাল এক্সপোজার, সামাজিক সংবেদনশীলতা এবং অভিযোজন সক্ষমতা— এই তিন সূচকের ভিত্তিতে কোন অঞ্চল বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে তা নির্ধারণ করা হচ্ছে। সেই অনুযায়ী বাজেট বরাদ্দও বাড়ানো হচ্ছে।
গবেষণাকে নীতিমালায় রূপান্তরের তাগিদ
গবেষকদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে স্থানীয় সরকার সচিব বলেন, গবেষণার ফল এমনভাবে উপস্থাপন করতে হবে, যাতে তা সহজেই সরকারি নীতিমালায় রূপান্তর করা যায়। তিনি বলেন, জাতীয় নগর নীতি ২০২৫ এবং জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখেই নগর স্বাস্থ্য সুরক্ষা পরিকল্পনা সাজানো হচ্ছে।
তিনি জানান, ২০৫০ সাল পর্যন্ত একটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা সরকারের রয়েছে, যেখানে হিট অ্যাডাপ্টেশনের জন্য প্রায় ২৩ কোটি ডলারের একটি নীতিগত ডকুমেন্ট প্রস্তুত করা হয়েছে।
উপকূলীয় ও বরেন্দ্র অঞ্চলের সংকট
দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের বিশেষ ঝুঁকির দিকগুলো তুলে ধরে সচিব বলেন, সাতক্ষীরাসহ ১৯টি উপকূলীয় জেলার ১৭২টি পৌরসভায় জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে নারীদের স্বাস্থ্য ও প্রজনন স্বাস্থ্যে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। অন্যদিকে, বরেন্দ্র অঞ্চলের প্রায় ৪০ শতাংশ এলাকায় ভূগর্ভস্থ পানির স্তর আশঙ্কাজনকভাবে নিচে নেমে গেছে।
এসব সংকট মোকাবিলায় বুয়েটসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞানভিত্তিক গবেষণাকে সরকার গুরুত্ব দিচ্ছে এবং বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিচ্ছে বলে জানান তিনি।
নারী উদ্যোক্তা ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি
নারী ক্ষমতায়নের অংশ হিসেবে সরকারের একটি নতুন উদ্যোগের কথাও তুলে ধরেন সচিব। তিনি জানান, দেশে প্রথমবারের মতো স্যানিটেশন খাতে নারীদের উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তোলার একটি প্রকল্প অনুমোদন পেয়েছে। এর আওতায় স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসায় ভেন্ডিং মেশিনের মাধ্যমে স্যানিটারি পণ্য উৎপাদন ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কাজ নারীরাই পরিচালনা করবেন।
এছাড়া জলবায়ু প্রশমনে সরকারি অফিসগুলোতে ছাদের সৌরবিদ্যুৎ বা রুফটপ সোলার ব্যবহারের ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের মোট জ্বালানি চাহিদার ৩০ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে পূরণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে বলে জানান তিনি।
এসময় ভবিষ্যৎ প্রজন্মের উদ্দেশ্যে স্থানীয় সরকার সচিব বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় কেবল পাঠ্যজ্ঞান নয়, উদ্ভাবনী উদ্যোগ ও স্টার্টআপ গড়ে তোলাও জরুরি। শিক্ষার্থীদের উদ্ভাবনী ভেঞ্চার তৈরিতে সরকার প্রয়োজনীয় সহায়তা দেবে, যাতে দেশীয় প্রযুক্তিতে টেকসই ও সাশ্রয়ী সমাধান বের করা যায়।
তিনি আরও বলেন, একাডেমিয়া, এনজিও ও উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গে সমন্বয় করে একটি জনবান্ধব ও প্রযুক্তিনির্ভর স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা গড়ে তোলাই সরকারের মূল লক্ষ্য।
আমার বার্তা/এমই

