
রাজধানীর সরকারি জমি উদ্ধার, যানজট নিরসন এবং নাগরিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে রাজউকের নিজস্ব জমিতে এক বিশাল উচ্ছেদ অভিযান পরিচালিত হয়েছে। অভিযানে দীর্ঘদিনের অবৈধ দখলকৃত জায়গা, নকশাবহির্ভূত বাণিজ্যিক স্থাপনা, অবৈধ দোকানপাটসহ বিভিন্ন ধরনের অবৈধ স্থাপনা গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। তবে এই বহুমুখী উচ্ছেদ অভিযানের পর সবচেয়ে বড় প্রতিক্রিয়া এসেছে অটোমোবাইল খাতের পক্ষ থেকে। উচ্ছেদকৃত উন্মুক্ত স্থানে গড়ে ওঠা অটোমোবাইল ওয়ার্কশপের বিপুল সংখ্যক কর্মী ও শ্রমিক তাদের কর্মসংস্থান এবং মানবিক জীবনযাপনের দাবিতে রাস্তায় নেমে মানববন্ধন ও আল্টিমেটাম দিয়েছেন। এই ঘটনাটি একদিকে ঢাকার পরিবেশ ও নিরাপত্তা, অন্যদিকে নিম্ন আয়ের শ্রমিকদের জীবিকার এক চরম বাস্তবতাকে মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।
আইনি এবং কৌশলগত দিক থেকে রাজউকের এই সামগ্রিক অভিযান সম্পূর্ণ যৌক্তিক এবং আইনসম্মত। টাউন ইমপ্রুভমেন্ট অ্যাক্ট, ১৯৫৩ এবং ইমারত নির্মাণ বিধিমালা অনুযায়ী, রাজউকের নিজস্ব জমিতে কোনো প্রকার অনুমতি ছাড়া বাণিজ্যিক কার্যক্রম চালানো বা অস্থায়ী শেড নির্মাণ করা দণ্ডনীয় অপরাধ। রাজউকের এই কঠোর পদক্ষেপ কোনো একক পেশার বিরুদ্ধে নয়, বরং সামগ্রিকভাবে ঢাকার দুই কোটি মানুষের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রয়াস। জনাকীর্ণ এলাকায় খোলা জায়গায় রাসায়নিক, ওয়েল্ডিং ও দাহ্য পদার্থ ব্যবহার করে গাড়ি মেরামত করায় যেকোনো সময় বড় ধরনের অগ্নিকাণ্ড ঘটতে পারে। এছাড়াও, এই সব ওয়ার্কশপের ক্ষতিকর বর্জ্য ও পোড়া মোবিল ড্রেনেজ লাইনে মিশে পরিবেশের মারাত্মক ক্ষতি করছে এবং ফুটপাত ও রাস্তা দখল করে তীব্র যানজটের সৃষ্টি করছিল। তাই পরিকল্পিত ও নিরাপদ মেগাসিটি গড়তে এবং অন্যান্য অবৈধ দখলদারদের কঠোর বার্তা দিতে রাজউকের এই অনড় অবস্থান অত্যন্ত প্রশংসনীয়।
তবে এই সংকটের অপর পিঠে জড়িয়ে আছে সাধারণ অটোমোবাইল শ্রমিকদের সাময়িক মানবিক সংকটের বিষয়টি। অভিযানে অন্যান্য অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ হলেও অটোমোবাইল শ্রমিকদের মানববন্ধন প্রমাণ করে যে এই খাতের ওপর নির্ভরশীল মানুষের সংখ্যা অনেক বেশি এবং আকস্মিক উচ্ছেদে তারা কর্মহীন হয়ে পড়েছেন। ঢাকা শহরের লাখ লাখ যানবাহনের দৈনন্দিন সচলতা বজায় রাখতে এই ওয়ার্কশপগুলো এক প্রকার জরুরি সেবা দিয়ে আসছিল। হুট করে এই খাতটি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সাধারণ গাড়ি চালকেরা যেমন সাময়িক ভোগান্তিতে পড়বেন, তেমনি এই নিম্ন-আয়ের কর্মীরাও সপরিবারে সংকটের মুখে পড়েছেন। তবে আইনের ঊর্ধ্বে গিয়ে বা আল্টিমেটাম দিয়ে সরকারি জায়গা পুনরায় দখলের সুযোগ দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই, কারণ এতে অন্য অবৈধ দখলদারেরা উচ্ছেদের বিরুদ্ধে একই ধরনের সুযোগ নেওয়ার চেষ্টা করবে।
বাস্তবতা হলো, আইন প্রয়োগের মাধ্যমে ঢাকা শহরের সৌন্দর্য, পরিবেশ ও নিরাপত্তা রক্ষা করা রাজউকের আইনগত বাধ্যবাধকতা এবং এখানে কোনো আপসের সুযোগ নেই। তবে রাজউকের উদ্ধারকৃত জমি কঠোরভাবে রক্ষণাবেক্ষণ করার পাশাপাশি, কেবল প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত অটোমোবাইল শ্রমিকদের মানবিক দিক বিবেচনা করে তাদের একটি নিয়মতান্ত্রিক গাইডলাইনের আওতায় আনা যেতে পারে। নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, শ্রমিকদের দাবির মুখে সরকারি জমি ফিরিয়ে দেওয়া আত্মঘাতী হবে; বরং দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের জন্য ঢাকার অদূরে বা নির্দিষ্ট কোনো বাণিজ্যিক জোনে পরিবেশবান্ধব "অটোমোবাইল ও লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং হাব" গড়ে তোলা উচিত। যেখানে কেবল নিবন্ধিত শ্রমিকেরা নিয়ম মেনে কাজ করতে পারবেন। আইন এবং নিয়ন্ত্রিত জীবিকার এই যৌক্তিক সমন্বয় ঘটানো গেলেই রাজউকের আইনি পদক্ষেপ সম্পূর্ণ সফল হবে এবং ঢাকা একটি নিরাপদ ও বাসযোগ্য মেগাসিটিতে রূপান্তরিত হবে।
আমার বার্তা/এমই

