
দীর্ঘদিনের প্রতিশ্রুতি আর অমিত সম্ভাবনার পূর্ণতা দিলেন মিরা আন্দ্রেভা। পোলিশ কোয়ালিফায়ার মায়া চাভালিনস্কার রূপকথার মতো পথচলাকে থামিয়ে নিজের ক্যারিয়ারের প্রথম গ্র্যান্ড স্ল্যাম শিরোপা উঁচিয়ে ধরলেন ১৯ বছর বয়সী এই রাশিয়ান টেনিস তারকা।
টুর্নামেন্ট শুরুর আগে যেখানে চাভালিনস্কা ছিলেন ৫০০-১ ব্যবধানে পিছিয়ে থাকা এক ‘আউটসাইডার’, সেখানে তাকে ফাইনালে ৬-৩, ৬-২ গেমে সরাসরি উড়িয়ে দিলেন আন্দ্রেভা।
এই জয়ের মাধ্যমে ১৯৯২ সালে মনিকা সিলিসের পর কনিষ্ঠতম নারী খেলোয়াড় হিসেবে ফ্রেঞ্চ ওপেন চ্যাম্পিয়ন হওয়ার কীর্তি গড়লেন এই রাশিয়ান অষ্টম বাছাই।
১ ঘণ্টা ২২ মিনিটের এই লড়াইয়ে জয় নিশ্চিত হতেই আনন্দে কোর্টে লুটিয়ে পড়েন আন্দ্রেভা। এরপর গ্যালারিতে ছুটে গিয়ে জড়িয়ে ধরেন তার কোচ কনচিতা মার্টিনেজকে, যিনি নিজে ১৯৯৪ সালের উইম্বলডন চ্যাম্পিয়ন।
ট্রফি জয়ের পর উচ্ছ্বসিত আন্দ্রেভা বলেন, খুব ছোটবেলা থেকেই আমি ফ্রেঞ্চ ওপেন দেখছি। এই ট্রফিটা জেতা সবসময়ই আমার স্বপ্ন ছিল।
অবশ্য ফাইনালের শুরুটা বেশ স্নায়ুচাপের ছিল। বাতাসের কারণে দুই খেলোয়াড়ই কিছুটা খেই হারিয়েছিলেন, যার ফলে ম্যাচের প্রথম চারটি গেমই ব্রেক হয়। তবে ১৫ হাজার দর্শক ধারণক্ষম গ্যালারিতে উপস্থিত পোলিশ সমর্থকদের গগনবিদারী উল্লাসের মাঝে বিশ্ব র্যাংকিংয়ের ১১৪ নম্বর তারকা চাভালিনস্কাই প্রথম নিজের সার্ভিস ধরে রাখতে পেরেছিলেন।
হাজারো পোলিশ সমর্থক চাভালিনস্কাকে জোরালো সমর্থন দিলেও, কোর্টে দারুণ পরিপক্বতা দেখান আন্দ্রেভা। নিজের মানসিক নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখে টানা ৯টি গেম জিতে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নেন এবং ৬-৩, ৫-০ ব্যবধানে এগিয়ে যান। ম্যাচের একদম শেষ মুহূর্তে নিজের সার্ভিসে ম্যাচ শেষ করতে না পারায় কিছুটা উত্তেজনা তৈরি হলেও, শেষ পর্যন্ত চাভালিনস্কার সার্ভিসে একটি দুর্দান্ত ব্যাকহ্যান্ড উইনার মেরে নিজের প্রথম চ্যাম্পিয়নশিপ পয়েন্টেই জয় নিশ্চিত করেন আন্দ্রেভা।
২০২৩ সালের মাদ্রিদ ওপেনে প্রথম আলোয় আসার পর থেকেই আন্দ্রেভাকে নিয়ে প্রত্যাশার পারদ ছিল তুঙ্গে। এমনকি ব্রিটেনের সাবেক বিশ্ব নম্বর ওয়ান অ্যান্ডি মারেও তার প্রতিভা ও নির্ভীক খেলার প্রশংসা করেছিলেন। স্পোর্টের সবচেয়ে বড় মঞ্চে আন্দ্রেভার এই সাফল্য পাওয়াটা কেবল সময়ের ব্যাপার বলেই মনে হচ্ছিল। তবে প্রবল স্পটলাইটের নিচে থেকে নিজের খেলাকে প্রতিনিয়ত উন্নত করা এবং হাইপ সামলানো মোটেও সহজ ছিল না।
সাইবেরিয়ায় জন্ম নেওয়া এবং ফ্রান্সে প্রশিক্ষণ নেওয়া আন্দ্রেভা ২০২৪ সালে ফ্রেঞ্চ ওপেনের সেমিফাইনালে উঠেছিলেন। এরপর কোচ মার্টিনেজের অধীনে তার খেলার উন্নতি চলতেই থাকে। গত দুই বছর ধরে একসঙ্গে কাজ করার পর, কোর্টেই কোচকে ধন্যবাদ জানিয়ে আন্দ্রেভা বলেন, ‘নিজের অভিজ্ঞতা শেয়ার করার জন্য এবং আমাকে এত এত পরামর্শ দেওয়ার জন্য উনাকে ধন্যবাদ।’
২০২৫ সালেও আন্দ্রেভার এই অগ্রযাত্রা বজায় ছিল। সে বছর দুটি ডব্লিউটিএ ১০০০ শিরোপা জিতে বিশ্বের শীর্ষ পাঁচ খেলোয়াড়ের তালিকায় জায়গা করে নেন তিনি। কোর্টে মাঝেমধ্যে মেজাজ হারানোর স্বভাব তার অল্প বয়সের কথা মনে করিয়ে দিলেও, এবারের প্যারিস সফরে তিনি যে পরিপক্বতা দেখিয়েছেন তা সত্যিই প্রশংসনীয়। বিশেষ করে, গত বৃহস্পতিবার সেমিফাইনালে রাজনৈতিক উত্তেজনার আবহ থাকা সত্ত্বেও যেভাবে ইউক্রেনের ১৫তম বাছাই মার্তা কস্ত্যুককে হারিয়েছেন, তা ছিল দেখার মতো।
ফাইনালে র্যাংকিং এবং অভিজ্ঞতার বিচারে আন্দ্রেভা ফেবারিট হলেও, চাভালিনস্কা তার বৈচিত্র্যময় শট দিয়ে ম্যাচের আবহ বদলে দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু বেসলাইন থেকে নিজের চেনা ছন্দ খুঁজে পাওয়ার পর আন্দ্রেভার পাওয়ারফুল শটের সামনে ক্রমশ অসহায় হয়ে পড়েন পোলিশ এই তারকা। দ্বিতীয় সেটে আন্দ্রেভা একবার ব্রেক পেতেই ম্যাচের ভাগ্য পুরোপুরি তার পক্ষে চলে আসে এবং গ্র্যান্ড স্ল্যাম চ্যাম্পিয়নদের তালিকায় নিজের নাম লেখান এই তরুণী।
আমার বার্তা/এমই

