শিরোনাম :

  • নয়াপল্টনে বিএনপির নেতাকর্মীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ জবানবন্দিতে বুলুসহ ১৫ বিএনপি নেতার নাম পেয়েছে পুলিশ সেনা অভ্যুত্থানবিরোধী বিক্ষোভে উত্তাল সুদান, সংঘর্ষে নিহত ৭দুই ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষ, নিহত ২
কালকিনির ইউপি নিবার্চন
সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নিবার্চনের দাবি স্বতন্ত্র প্রার্থীদের
নিবার্চনী আচরন বিধি ভেঙ্গে সাংসদ এলাকায় থাকায় বেপরোয়া নৌকার প্রার্থীরা
লিখন মুন্সী (মাদারীপুর) প্রতিনিধি
০৭ নভেম্বর, ২০২১ ২১:৫৭:৪১
প্রিন্টঅ-অ+


ঘটনাবহুল মাদারীপুরের  কালকিনি উপজেলার বিভিন্ন ইউপি নিবার্চনকে ঘিরে জনমনে নানা প্রশ্ন। তফসিল ঘোষণার পর থেকে বিভিন্ন ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেই চলছে। মনোনয়নপত্র ছিনতাই, স্বতন্ত্র প্রার্থীদেরকে মারধোর করে নিখোজ করে পরে তার থেকে প্রার্থীদের প্রত্যাহার,স্বতন্ত্র প্রার্থীদের বাড়িতে হামলা ভাংচুড়-কর্মীদের মারধোর করে আহত করা, ভুক্তভোগীদের অভিযোগ দিতে থানায় ঢুকতে না দেয়াসহ নৌকা পুড়িয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থীদের ফাসানোর ঘটনার পাশাপাশি নৌকার প্রার্থীদের মিছিলে শত শত বৈঠা নিয়ে সোডাউন দিয়ে আতংক সৃষ্টি করার মত অনেক অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয় সাংসদ আচরণ বিধি ভঙ্গ করে উন্নয়নমূলক কাজের অজুহাত দেখিয়ে এলাকায় অবস্থান করায় নিবার্চনী পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে বলে বিভিন্ন ইউনিয়নের স্বতন্ত্র প্রার্থীরা লিখিত অভিযোগ দায়ের করে। স্বতন্ত্র প্রার্থীদের বাড়িতে হামলা ও কর্মীদের মারধোরের ঘটনায় কোন ব্যবস্থা না নেয়ার অভিযোগ রয়েছে রিটার্নিং কর্মকতার্র বিরুদ্ধে। সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ দাবি স্বতন্ত্র প্রার্থীসহ সচেতন কালকিনিবসীসহ সর্বস্তরের জনগনের।

অভিযোগ ও স্থানীয়সূত্রে জানা যায়, তফসিল ঘোষণার পর থেকে বিভিন্ন ধরনের ঘটনা ঘটছে। এসব কারণে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নিবার্চনের শংকা রয়েছে । ১৬ অক্টোবর চরদৌলত খান ও সাহেবরামপুর  ইউনিয়নের স্বতন্ত্র প্রার্থী মাহবুবুর রহিম মুরাদের মনোনয়নপত্র ছিনতাইয়ের অভিযোগ করা হয় নৌকার প্রার্থীর লোকদের বিরুদ্ধে।  প্রার্থীতা প্রত্যাহারের শেষ দিন (২৬ অক্টোবর) কালকিনি উপজেলা চত্বরে সাংসদ আব্দুস সোবাহান গোলাপের আপন ভাইয়ের প্রতিদ্ব›দ্বী আলিনুর তালুকদার ও তার লোকদের মারধোর করা হয়। কয়েক ঘন্টা নিখোজ থাকার পরে প্রার্থীতা প্রত্যাহার করে আলিনুর তালুকদার। প্রতীক বরাদ্দ দেয়ার পরের দিন ২৮ অক্টোবর আলিনগর ইউনিয়নের স্বতন্ত্র প্রার্থী হাফিজুর রহমান মিলন সরদারের বাড়িতে হামলা ও ভাংচুর চালায় নৌকার প্রার্থী শাহিদ পারভেজের লোকজন। ওই ঘটনায় মিলন সরদারের প্রাইভেটকার, ১০ টি মটরসাইকেল ভাংচুর ও বোমা বিষ্ফোরণ ঘটানো হয়। একই দিনে হামলা চালানো হয় শিকারমঙ্গল ইউনিয়নের স্বতন্ত্র প্রার্থী বীর মুক্তিযোদ্ধা সিরাজ মালের বাড়িতে ও তার লোকদের মারধোর  করে আহত করা হয়। তার পর থেকে আতংকে দিন কাটছে স্বতন্ত্র প্রার্থীদের। অনেক স্বতন্ত্র প্রার্থী অবরুদ্ধ অবস্থায় রয়েছে নিজ বাড়িতে। সুষ্ঠু নিবার্চনী পরিবেশের যতটুকু আশা ছিল তাও শেষ হয়েছে সাংসদের নিবার্চনী আচরনবিধি ভঙ্গ করে এলাকায় অবস্থান করায়। স্বতন্ত্র প্রার্থী ও সাধারণ ভোটারদের দাবি সংঘাতমুক্ত নিরপেক্ষ নিবার্চন।

কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক ও মাদারীপুর ৩ আসনের (কালকিনি-ডাসার) সাংসদ ড. আবদুস সোবহান গোলাপের বিরুদ্ধে নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠেছে। ৩ নভেম্বর থেকে তিনি (সাংসদ) নিজ বাড়িতে অবস্থান করে আসন্ন ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে নৌকা প্রতীকের চেয়ারম্যান প্রার্থীদের দিকনির্দেশনা দেয়া ও প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ এনে আটটি ইউনিয়নের স্বতন্ত্র চেয়ারম্যান প্রার্থীরা পৃথকভাবে অভিযোগ দাখিল করেন । এমপি এলাকায় থাকায় দলীয় লোকজন স্বতন্ত্র প্রার্থীর কর্মী-সমর্থকদের মারধর করছে, এমন অভিযোগ এনে মাদারীপুর আদালত ও থানায় কয়েকটি মামলাও হয়েছে বলে জানা যায়। এ বিষয়ে কালকিনির নির্বাচন কর্মকর্তা কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছেন না বলেও অভিযোগ রয়েছে স্বতন্ত্র প্রার্থীদের। লিখিত অভিযোগ দেওয়া অন্যতম প্রার্থীরা হলেন শিকারমঙ্গল ইউপির স্বতন্ত্র চেয়ারম্যান প্রার্থী এম এ কুদ্দুস ব্যাপারী, কয়ারিয়া ইউপির স্বতন্ত্র প্রার্থী তোফায়েল আহমেদ, কামরুল হাসান নুর মোহাম্মদ মোল্লা, চরদৌলতখান ইউপির আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী মিলন মিয়া, সাহেবরামপুর ইউপির আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী মাহবুবুর রহিম এবং গোপালপুর ইউপির স্বতন্ত্র প্রার্থী মো. ফরহাদ মাতুব্বর।

স্বতন্ত্র প্রার্থীদের অভিযোগে বলা হয়, নির্বাচনি আচরণবিধির ২৫ (১) ধারা অনুযায়ী নির্বাচন-পূর্ব সময়ে কোনো সরকারি, আধা সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে রাজস্ব বা উন্নয়ন তহবিলভুক্ত কোনো প্রকল্পের অনুমোদন, ঘোষণা বা ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন কিংবা ফলক উন্মোচন করা যাবে না। আবদুস সোবহান গোলাপ এমপি এই বিধিনিষেধ উপেক্ষা করে এনায়েতনগর ও পূর্ব এনায়েতনগর ইউনিয়নে কয়েকটি উন্নয়নমূলক কাজের ফলক উন্মোচন করেন। এমপি গোলাপের বাড়ি উপজেলার রমজানপুর ইউনিয়নেও নির্বাচন হচ্ছে। তিনি এলাকায় অবস্থান করায় নৌকার প্রার্থী ও কর্মীরা স্বতন্ত্র ও বিদ্রোহী প্রার্থীদের সমর্থকদের নির্বাচনি প্রচারে বাধা দিচ্ছেন। এই বাধাদান ও মারধরের প্রতিবাদে কালকিনি থানা ও মাদারীপুর আদালতে তারা মামলা করেছেন।

স্বতন্ত্র প্রার্থীরা জানান, এমপি গোলাপের আচরণবিধি লঙ্ঘনসহ বিভিন্ন বিষয় উল্লেখ করে আমরা রিটার্নিং অফিসারের কাছে লিখিত অভিযোগ দাখিল করেছি। আমরা রিটার্নিং অফিসার বরাবর আমাদের ওপর অত্যাচার , নির্যাতন, নির্বাচনে বাধা প্রধান , ঘরবাড়ি  ভাংচুর , পোস্টার , ব্যানার ছিড়ে ফেলার অভিযোগ দিয়েছি।  কিন্তু এখনও কোনো প্রতিকার পাইনি। উল্টো লোক দিয়ে নৌকা পাহাড়া দিতে হয় যাতে নিজেরা নৌকা পুড়ে বা ভেঙ্গে আমাদের মিথ্যা মামলা না দেয়।  আমরা আসন্ন ইউপি নির্বাচন সুষ্ঠু , নিরপেক্ষ, এমপির হস্তক্ষেপমুক্ত শান্তিপূর্ণ নিবার্চনের জোর দাবি জানাই। কয়েকটি ইউনিয়নের ভোটারদের কাছে জানতে চাইলে তারা বলেন, আমরা সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নিবার্চনে চাই।,আমরা কোন সংঘাত বা প্রাণহানী চাই না। প্রার্থী যারা আছে প্রায় সবাই আওয়ামী লীগের লোক।  

নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক আওয়ামী লীগ নেতা বলেন, সংসদ সদস্য ড. আবদুস সোবহান মিয়া (গোলাপ) এমপি যে কাজের ভিত্তি প্রস্তর উদ্বোধন করতে নিবার্চনকালীন সময়ে এসেছে সেই কাজের এখনো টেন্ডার হয়নি বলে জানতে পেরেছি। এসব এলাকায় থাকার ফন্দি মাত্র। পৌরসভা নিবার্চনেও সে এমন ই করেছিলেন।  মাদারীপুরের শিবচর , মাদারীপুর সদর ও রাজৈর উপজেলায় নৌকা প্রতীক দেয়া হয়নি শুধু কালকিনিতে নৌকা দেয়ার পিছনে ব্যক্তি স্বার্থ ছাড়া অন্য কোন কারন খুজে পায়নি উপজেলা আওয়ামী লীগ। যাদের নৌকা প্রতীক দেয়া হয়েছে তারা প্রায় সবাই জনপ্রিয়তায় অনেক পিছিয়ে । আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে যে নৌকা প্রতীক দেয়া হয়েছে তা কালকিনিতে এখন ওপেন সিক্রেট। শাজাহান খান এমপি ও নুর ই আলম চৌধুরী লিটন এমপি যে দলের কথা চিন্তা করে প্রতীক নেয়নি এ জন্য তাদের হাজার সালাম। কালকিনি উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা ও রিটার্নিং কর্মকর্তা দীপংকর বিশ্বাস বলেন, নির্বাচনি এলাকায় সংসদ সদস্যদের থাকার বিধান নেই। তবে এমপি যদি ব্যক্তিগত কাজে আসেন তাহলে থাকতে পারবেন। কিন্তু কোনো অবস্থায়ই নির্বাচনি প্রচারে অংশ নিতে পারবেন না। মাদারীপুর-৩ আসনের এমপির বিরুদ্ধে কয়েকজন প্রার্থী অভিযোগ দিয়েছেন। তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

তবে কালকিনি উপজেলা চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মীর গোলাম ফারুক বলেন, এমপি তার ব্যক্তিগত কাজে বাড়িতে এসেছেন। আর তিনি যে ইউনিয়নে উন্নয়নকাজের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছেন, সেখানে নির্বাচন হচ্ছে না। তিনি কোনো নির্বাচনি জনসভায়ও যোগ দেননি। কিছু প্রার্থী গিয়ে তার সঙ্গে কুশল বিনিময় করেছেন। এটা দোষের কিছু নয়। মাদারীপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন ও অপরাধ) চাইলাউ মারমা বলেন, আইনশৃঙ্খলা ঠিক রাখতে আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি। কয়েকটি ইউনিয়নে বিচ্ছিন্ন ঘটনায় পুলিশ মোতায়েন করা আছে। ভোট গ্রহণ পর্যন্ত আমাদের কঠোর অবস্থান থাকবে। কালকিনি উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য অধ্যাপিকা তাহমিনা বেগম বলেন, আমরা কেউই আইনের ঊর্ধ্বে নই। ইদানীং কালকিনিতে আওয়ামী লীগের প্রভাব খাটিয়ে যা হচ্ছে তা কোনোভাবেই কাম্য নয়। যারা স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন, তারা সবাই আওয়ামী লীগের লোক। এখানে জোরজুলুমের কোনো সুযোগ নেই। বর্তমান এমপি কেন্দ্রীয় বড় নেতা। তার বিষয়ে আমি তেমন কিছু বলতে চাই না। থতবে নৌকা প্রতীক যাদের দেয়া হয়েছে সেটা তার একক সিদ্ধন্তই বলা চলে। অভিযোগের বিষয়ে জানতে আব্দুস সোবাহান গোলাপ এমপির মুঠোফোনে একাধিকবার কল করলেও কল রিসিভ না করায় তার সাথে কথা বলা সম্ভব হয়নি।



 


আরো পড়ুন