শিরোনাম :

  • নয়াপল্টনে বিএনপির নেতাকর্মীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ জবানবন্দিতে বুলুসহ ১৫ বিএনপি নেতার নাম পেয়েছে পুলিশ সেনা অভ্যুত্থানবিরোধী বিক্ষোভে উত্তাল সুদান, সংঘর্ষে নিহত ৭দুই ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষ, নিহত ২
ডিএসসিসির একাল-সেকাল পর্ব-৪
রক্ষকই যখন ভক্ষক
হাসান মাহমুদ রিপন
০৯ নভেম্বর, ২০২১ ২১:৫৬:৪৬
প্রিন্টঅ-অ+


বেআইনি কিছু হবার কোনো সুযোগ নেই, হতে দেব না-আরিফুল হক, প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা, ডিএসসিসি



‘রক্ষকই যখন ভক্ষক’- এ প্রবাদ বাক্যটি দেশের সমাজ বাস্তবতায় কতখানি সত্য এর প্রমাণ মেলে কখনো কখনো উৎকটরূপে। নির্যাতনের শিকার ক্রমাগত বেড়েই চলছে। অপরাধমূলক অনেক ঘটনা নীরবে ঘটে যায়, যা কেউ জানেই না। তাই বিচারের তো কোনো প্রশ্নই আসে না। ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের (ডিএসসিসি) বর্তমান মেয়রের দায়িত্ব গ্রহণের পূর্বে প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই চলেছে সীমাহীন অনিয়ম আর দুর্নীতি। তৎকালীন সময়ে দায়িত্ব পেয়েই অনিয়ম-দুর্নীতিতে জড়িয়ে অনেকে হয়েছেন কোটি কোটি টাকার মালিক, যা এখনো বহাল তবিয়তে অনেক দপ্তরে রয়েছে। তবে পূর্বে এসব দাপটের সঙ্গে হলেও এখন কিছুটা রাখঢাক করে হচ্ছে। ডিএসসিসিতে বিগত মেয়রের ও বর্তমান মেয়রের ঘটনা নিয়ে দৈনিক আমার বার্তার ধারাবাহিক প্রতিবেদনের আজ প্রকাশিত হলো চতুর্থ পর্ব।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের (ডিএসসিসি) অন্তর্ভুক্ত নিউমার্কেট মেইনের দোকান নং ৩৭৪-এর বৈধভাবে হস্তান্তর হবার পরও অজুহাত সৃষ্টি করে হয়রানি করেছে রাজস্ব কর্মকর্তা (চলতি দায়িত্ব) আবুল খায়ের। ন্যায়ের বিপক্ষে দাঁড়াতে করেছেন বিশাল অঙ্কের টাকা লেনদেন। ব্যক্তিস্বার্থ হাসিলে প্রতিপক্ষকে পরামর্শ দিয়ে আদালতে মামলা করিয়ে ন্যায়বিচার প্রার্থনাকারীকে করেছেন হেনস্তা ও হয়রানী। সমাজ-সচেতনদের মতে, ন্যায়বিচার যিনি করবেন তিনিই যখন লোভে পড়ে অন্যায়কারীদের পক্ষ নিয়ে ন্যায়ের বিপক্ষে দাঁড়িয়ে হয়রানি করেন, তখন সাধারণ মানুষ আশাহত হয়ে নীরবে-নিভৃতে আহাজারি করে আর সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের প্রতি বিষোদ্গার করতে থাকেন। পাশাপাশি বিচ্যুতি হতে থাকে ন্যায় থেকে। এ ব্যাপারে ডিএসসিসির প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা আরিফুল হক বলেন, ‘আমি বিষয়টির পূর্ণাঙ্গ জানি না, তাই বিস্তারিত মন্তব্য করতে পারছি না। তবে এখানে বেআইনি কিছু হবার কোনো সুযোগ নেই, হতে দেব না।’

জানা গেছে, ঢাকা নিউমার্কেট মেইনের ৩৭৪নং দোকানের জাহানারা বেগম, সাহাবুদ্দিন, শাহাদৎ হোসেন, আওলাদ হোসেন, জাকির হোসেন, শাহেদা বেগম, চাঁদ সুলতানা (আলো), শাহনাজ বেগম ওয়ারিশ সূত্রে মালিক। তারা দোকানের দখলস্বত্ব হস্তান্তরের ঘোষণা দিলে ডিএসসিসির সাবেক রেন্ট অ্যাসিট্যান্ট শফিউল আলমের মাধ্যমে মো. মাহফুজুর রহমান আগ্রহ প্রকাশ করে এবং দাম ২ কোটি ৬৫ লাখ টাকা নির্ধারণ করা হয়। এতে উভয় পক্ষ সম্মতি থাকায় প্রথমে ৫ লাখ টাকা বায়না হিসেবে দেয়া হয় এবং বাকি টাকা ২০২০ সালের ১৬ নভেম্বর আইনজীবী অ্যাডভোকেট এনামুল হক মোল্লার উপস্থিতিতে পে-অর্ডারের মাধ্যমে পরিশোধের সিদ্ধান্ত হয়। কিন্তু ঐদিন হস্তান্তর দলিলে ৬ জন মালিকের স্বাক্ষর হলে মো. মাহফুজুর রহমান পে-অর্ডার না দিয়ে সটকে পড়েন। পরবর্তীতে মালিকগণ মাহফুজুর রহমানের বিভিন্ন সময় মৌখিকভাবে সম্পূর্ণ টাকা পরিশোধের তাগাদা দিলে তিনি টালবাহানা করেন এবং একপর্যায়ে তাদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার শুরু করেন। এতে মালিকপক্ষ দোকানটি অন্যত্র বিক্রয়ের সিদ্ধান্ত নেন এবং পূর্বের নির্ধারিত মূল্যেই আবুল কালাম নামের এক ব্যক্তির নিকট বিক্রয় করেন। তাদের চ‚ড়ান্ত লেনদেনের পর দোকানটির মালিকগণ তৎকালীন রাজস্ব কর্মকর্তা (চলতি দায়িত্ব) আলীম আল রাজির কাছে উপস্থিত হয়ে শুনানি করে গেলেও বর্তমান রাজস্ব কর্মকর্তা আবুল খায়ের তা মানতে নারাজ বলে জানান এবং পুনরায় শুনানির কথা বলেন।

সূত্র মতে, মো. মাহফুজুর রহমান দোকানের মালিকগণকে দেয়ার জন্য চুক্তির সম্পূর্ণ টাকার পে-অর্ডার করে রাখেন ২০২০ সালের ১৫ নভেম্বর। যার নম্বর পিও ১৫২৮৯৫২, ১৫২৮৯৫৩, ১৫২৮৯৫৪, ১৫২৮৯৫৫, ১৫২৮৯৫৬, ১৫২৮৯৫৭, ১৫২৮৯৫৮,  ১৫২৮৯৫৯। হস্তান্তর দলিলে দোকান মালিকদের ৬ জনের স্বাক্ষরের পর এই পে-অর্ডারগুলি তাদের বুঝিয়ে না দিয়ে মাহফুজুর রহমান ২০২০ সালের ২৪ নভেম্বর তার নিজের ব্যাংক হিসাব নম্বরে পুনরায় জমা করে নেন। অভিযোগ রয়েছে, আবুল খায়ের রাজস্ব কর্মকর্তা হিসেবে যোগদানের পরই সাবেক রেন্ট অ্যাসিট্যান্ট শফিউল আলমসহ মো. মাহফুজুর রহমান দেখা করেন এবং এ দোকানটি শুনানির মাধ্যমে পাইয়ে দেয়ার ৫ লাখ টাকার একটা চুক্তি করেন। এর পরই আবুল খায়ের নতুন করে শুনানির কথা বলে ৪ এপ্রিল, ২৪ জুন এবং ২৯ জুন শুনানি শেষ করেন। শুনানি শেষে যখন বুঝতে পারলেন মাহফুজকে দোকান পাইয়ে দেয়া খুবই দুরূহ ব্যাপার তখনই তিনি চ‚ড়ান্ত রিপোর্ট না দিয়ে দীর্ঘদিন গড়িমসি করতে থাকেন। পাশাপাশি তিনি মাহফুজকে আদালতের শরণাপন্ন হয়ে তা উল্লেখ করে ডিএসসিসিকে অবহিত করলে রিপোর্ট স্থগিত হবে মর্মে পরামর্শ দেন। তার পরামর্শ অনুযায়ী মাহফুজুর রহমান প্রায় দুই মাস পর মুখ্য মহানগর হাকিম আদালত এবং যুগ্ম জেলা জজ ৩য় আদালতে আলাদাভাবে দুটি মামলা করেন এবং ডিএসসিসিকে মামলার বিষয় অবহিত করে রিপোর্ট দেয়ায় স্থগিত করান। মুখ্য মহানগর হাকিম আদালতের সি.আর মামলা নং-৮৬/২০২১ এবং যুগ্ম জেলা জজ ৩য় আদালতের দেওয়ানি মোকর্দ্দমা নং ১৩৩/২০২১, তাং ১৯/০৮/২০২১। এর মধ্যে মুখ্য মহানগর হাকিম আদালতের মামলাটি পুলিশ ব্যুরো ইনভেস্টিগেশনকে (পিবিআই) তদন্তের দায়িত্ব প্রদান করা হয়। ইতোমধ্যেই পিবিআই তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই মো. ফরিদ উদ্দিন তার তদন্ত রিপোর্ট আদালতে জমা দিয়েছেন।

এ বিষয়ে পিবিআই তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই মো. ফরিদ উদ্দিন জানান, ‘মামলায় মাহফুজুর রহমানের দাবির সত্যতা মেলেনি। তিনি দোকান মালিকদের জন্য পে-অর্ডার করে তা আবার নিজের ব্যাংক হিসাব নম্বরে জমা করে নিয়েছেন। তাছাড়া তিনি দোকান মালিকদের বায়না বাবদ ১০ লাখ টাকা দিয়েছেন তারও সত্যতা মেলেনি।’

মো. আবুল কালাম এ বিষয়ে বলেন, ‘আমি রাজস্ব কর্মকর্তা আবুল খায়েরের কাছে ন্যায়বিচার চাইতে গিয়ে হয়রানি ও হেনস্থার শিকার হয়েছি। শুনেছি তিনি এর পূর্বেও দুর্নীতি-অনিয়মের কারণে একাধিকবার শাস্তি ভোগ করেছেন। কিন্তু তা থেকে শিক্ষা নিয়েছেন বলে আমার মনে হচ্ছে না।

তিনি বলেন, সাবেক রেন্ট অ্যাসিট্যান্ট শফিউল আলম তার এলাকার লোক হওয়ার সুবাদে রাজস্ব কর্মকর্তা আবুল খায়ের বিশ্বস্ততার সঙ্গে মাহফুজুর রহমানের সঙ্গে ৫ লাখ টাকার চুক্তি করে নিয়েছেন। এর ফলে আমরা ডিএসসিসিতে এ ব্যাপারে তার কাছে গেলেই তিনি চরম অসদাচরণ করে অফিস কক্ষ থেকে বের করে দিতেন। অথচ একই সময় শফিউল আলম এবং মো. মাহফুজুর রহমান তার কক্ষে আড্ডা দিত আর চা পান করত।’

তিনি বলেন, আমার সঙ্গে দোকানের মালিক পক্ষের দখলস্বত্ব হস্তান্তরের কথা হওয়ার পর অনুষাঙ্গিক সকল কার্যক্রম শেষে তারা ডিএসসিসির রাজস্ব বিভাগে এসে তৎকালীন রাজস্ব কর্মকর্তা আলীম আল রাজীর সামনে শুনানি করে যান। কিন্তু উদ্দেশ্যমূলকভাবে বর্তমান রাজস্ব কর্মকর্তা তার কাছে পুনরায় শুনানি করতে হবে মর্মে জানিয়ে দেন। পুনরায় দোকানের মালিকগণ শুনানি করে গেলেও রিপোর্ট দিতে তিনি প্রায় দুই মাস পার করে দেন। পরে জানতে পেরেছি দোকানের মালিকগণ আমাকে হস্তান্তর করেছেন তাই তিনি রিপোর্ট আটকে দিতে আমার প্রতিপক্ষকে আদালতে মামলা দিতে উসকে দেন।

এ ব্যাপারে অবুল খায়ের বলেন, ‘আমি কাউকে মামলা করতে উসকাসি দেইনি। তারা মামলা করে ডিএসসিসিকে জানিয়েছে। যার ফলে আমরা শুনানি শেষে কার্যক্রম স্থগিত করে রেখেছি।’

৫ লাখ টাকা ঘুষ চুক্তির ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘কোন কু... বাচ্চা বলেছে আমার সামনে এসে বলতে বলেন আমি ঘাড় থেকে ওর মাথা কেটে ফেলে দেব।’

অপর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমি ডিএসসিসির কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে কোনো গণমাধ্যম কর্মীদের ভুয়া তথ্য দিয়ে সংবাদ পরিবেশন করাইনি, এটি সঠিক নয়। আমার কাছে তথ্যের জন্যে কিছু সংবাদকর্মী আসে, তবে তাদের আমি এ ব্যাপারে জনসংযোগ কর্মকর্তার কাছে যেতে বলি।’

নৈরাজ্যের অপছায়ার সমাজদেহে নানারকম অপক্রিয়ার মাধ্যমে বিস্তার ঘটে। এসব ক্ষেত্রে রক্ষকদের ভক্ষক হয়ে ওঠার প্রেক্ষাপট নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ভাবতে হবে। বন্ধ করতে হবে সেই পথ। রক্ষক যেন ভক্ষকে রূপান্তরিত হতে না পারে, এজন্য জবাবদিহিতা-দায়বদ্ধতার বিষয়গুলো পুষ্ট করার প্রক্রিয়া করতে হবে বেগবান। চোর না শুনে ধর্মের কাহিনী- এ প্রবাদবাক্যটি যদিও দেশের সমাজ বাস্তবতায় খুব প্রযোজ্য, তারপরও ভরসার জায়গা সঙ্কুচিত করার উপায় নেই। সদাচারের বিষয়গুলো সমাজের স্তরে স্তরে হয়ে উঠুক দৃষ্টান্তযোগ্য। রক্ষক থাকুক রক্ষক হয়েই।

 


আরো পড়ুন