শিরোনাম :

  • নয়াপল্টনে বিএনপির নেতাকর্মীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ জবানবন্দিতে বুলুসহ ১৫ বিএনপি নেতার নাম পেয়েছে পুলিশ সেনা অভ্যুত্থানবিরোধী বিক্ষোভে উত্তাল সুদান, সংঘর্ষে নিহত ৭দুই ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষ, নিহত ২
বিকৃতই যখন প্রকৃত!
০২ মার্চ, ২০২২ ১১:৩৫:০৭
প্রিন্টঅ-অ+

বাংলাভাষা নিয়ে বিভিন্ন সভা-সমিতিতে তো দেখি জ্বালাময়ী ভাষণ দেন। অথচ বলার সময় বাংলা-ইংরেজি মিশিয়ে কথা বলেন! * ইউ নো ব্রো, আমি বাংলা-ইংরেজি মিলিয়ে একটা বাংলিশের ফিউশন তৈরি করেছি!


প্রকৃত


রফিক সাহেবের নামের সঙ্গে ভাষা শহিদের নামের মিল আছে। তিনি নিজেও বর্তমানে ভাষার জন্য যুদ্ধ করে চলেছেন। সুখের বিষয় ওনাকে অন্তত ভাষার জন্য শহিদ হতে হয়নি। অবশ্য ভাষার যখন বিকৃতি দেখেন তখন নিজেকে মৃত ভাবতেই পছন্দ করেন তিনি।


তার মতো মধ্যবয়সি মানুষ দুটো সামাজিক অবস্থার সাক্ষী। একটি এনালগ অথবা মোবাইল ফোন আসার পূর্ববর্তী যুগ, অন্যটি স্মার্টফোন আসার পরবর্তী যুগ। প্রযুক্তির যুগ যেন পণ করেই এসেছিল, ভাষার দফারফা করে ছাড়বে। পণ্য বিক্রির জন্য ভাষা বিকৃতি সেই ‘জটিল-কঠিন’ দিয়ে শুরু। রফিক সাহেবের কষ্টের শুরুও সেই তখন থেকেই। জটিল সব সময় নেগেটিভ বা ঋণাত্মক হিসাবেই ব্যবহারে অভ্যস্ত ছিলেন তিনি। সাধারণত সমস্যা বা অবস্থার ঋণাত্মক ধরন বোঝাতে এটা ব্যবহার করা হতো। কিন্তু মোবাইল ফোনের যুগ এসে যেন অনেক হিসাব পাল্টে দিল। ফলে জটিল আর জটিল থাকল না, হয়ে গেল বিশেষণ। রফিক সাহেবের বাসায় দাওয়াত খেতে এসে তার এক ভাতিজা বলে উঠল, ‘চাচি, গরুর মাংসটা জটিল হইছে!’ কথাটা শুনে রফিক সাহেবের মনে খটকা লাগল। ছেলেটা তো শিক্ষিতই জানতাম, নাকি পরে লেখাপড়া ছেড়ে দিয়েছিল? তা না হলে জটিল শব্দের ব্যবহার জানবে না কেন? রফিক সাহেব একটু মাথা খাটাতেই মনে পড়ল, তার ভাতিজা প্রাইভেট ইউনিভার্সিটিতে ভালো একটা সাবজেক্ট নিয়ে পড়াশোনা করে এবং ছাত্রও বেশ ভালো। সুতরাং তার শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার প্রশ্নই ওঠে না! পরবর্তীতে রফিক সাহেব জানতে পেরেছিলেন জটিলের আধুনিক অর্থ কী? রফিক সাহেবের বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মোবাইল ফোনও সহজলভ্য হতে থাকে। এখন যার তার হাতেই দেখা যায় এটি। প্রায় সবাই এখন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করে। কিন্তু মোবাইল বা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহারের দক্ষতা সবার এক রকম নয়। ফলে কেউ কেউ দক্ষতার অভাবে হোক কিংবা বানানের সঠিক জ্ঞানের অভাবেই হোক-সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভুলভাল শব্দ ব্যবহার করেন নিয়মিত। ব্যস, আর পায় কে? লাইক শিকারি মানুষজন সেটিকেই হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার করে লাইক শিকারে নেমে পড়ল। এভাবেই যাত্রা শুরু হলো-‘গেবন’, ‘কিয়েক্টা অবস্থা’ ইত্যাদির ব্যবহার। এরপর সহজেই অনুধাবন করা যায় রফিক সাহেবদের অবস্থা। যারা জটিল-কঠিন যুগে কঠিন (আক্ষরিক অর্থেই) সময় পার করেছেন, তাদের ‘কিয়েক্টা’ অবস্থার ভেতর দিয়ে যেতে হচ্ছে।


একটা সময় নাটকের ভাষা ছিল খুবই পরিশীলিত এবং মার্জিত। সেখানে এখন ঢুকে গেল বিভিন্ন আঞ্চলিক ভাষা। এতে খারাপের কিছু নেই, ভাষার বিস্তার ঘটতেই পারে। কিন্তু সেই আঞ্চলিক ভাষার চেয়ে অনেক নাট্যকার বা নির্মাতা আঞ্চলিক গালাগালকেই উপজীব্য করার চেষ্টায় যখন মত্ত, তখনই আবার আবির্ভাব হলো ওটিটি যুগের।


আর পায় কে! ওটিটি যুগকে অনেকেই বেছে নিয়েছেন মনের সুখে গালির ব্যবহারের মাধ্যম। যে গালি টিভি-সিনেমায় দিতে হয়তো একটু দ্বিধা হতো এখানে নির্দ্বিধায় তা দেওয়া যায়। রফিক সাহেব ভেবে পান না, মানুষকে বিনোদন দিতে গালি দেওয়াটা জরুরি কেন? দিন শেষে নাটক-সিনেমা তো বিনোদনের মাধ্যমই। তাই বলে লোক হাসাতে বা চরম কোনো মুহূর্তকে বোঝাতে ‘গালি’ই কি শ্রেষ্ঠ উপায়? রফিক সাহেব উত্তর পান না। সোশ্যাল মিডিয়া এবং তথাকথিত ওটিটি প্ল্যাটফরম এখন শুধু ভাষা বিকৃতির প্রতিযোগিতাতেই নামেনি বরং যেন সমাজটাই বদলে দিয়েছে। রফিক সাহেব তরুণ প্রজন্মের ভাষার অনুবাদের জন্য না হয় সোশ্যাল মিডিয়ায় ঢু মারেন। কিন্তু আরও নিচের যে প্রজন্ম রয়েছে, কিশোর প্রজন্ম এদের ভাষার অনুবাদের ক্ষমতা তো রফিক সাহেবের নেই। কদিন আগে রফিক সাহেব তার মুঠোফোন থেকে একটা ছবি আপলোড করতে পারছিলেন না সোশ্যাল মিডিয়ায়। আপলোড করতে গিয়ে গ্যালারিতে ছবিটা খুঁজে পাচ্ছিলেন না। তাই নয় বছর বয়সের নাতিকে যখন বলা হলো এটা করে দিতে, সে কয়েক সেকেন্ডে ছবিটা আপলোড করে দিয়ে বলল, ‘দাদু, তুমি একটা বট! তুমি কিছুই পারো না!’ রফিক সাহেব প্রথমে একটু কষ্ট পেলেন, নাতি তাকে ‘বদ’ বলল! এটুকু একটা বিষয়ের জন্য বদ হয়ে গেলেন তিনি? পরে মনে পড়ল, নাতি তো বলেছে ‘বট’!


রাখঢাক না করে ওকে শেষে জিজ্ঞেস করলেন, ‘দাদু, তুমি যে আমাকে ‘বট’ বললে এর মানে কী?’


নাতি বলল, ‘তুমি সত্যি একটা ‘বট’! ‘বট’ হচ্ছে রোবটের শর্ট ভার্সন, মানে যাদের নিজস্ব জ্ঞান নেই!’ রফিক সাহেব ভেবে দেখলেন, তিনি আসলেই একটা বট! বর্তমান ভাষার সম্পর্কে তার কোনো জ্ঞানই নেই!

আরো পড়ুন