শিরোনাম :

  • আন্তর্জাতিক কাস্টমস দিবস আজ আসছে বৃষ্টি, এরপর তীব্র শীত মজনুর ডিএনএ পরীক্ষায় ধর্ষণের সম্পৃক্ততা মিলেছে চেকআপ না করেই মালয়েশিয়া থেকে পালাল চীনা পরিবার
সত্যকথন । মাসউদুল কাদির
তাবলিগের সূচনা ও ক্রমবিকাশ ও বিশ্ব ইজতেমা
১৪ জানুয়ারি, ২০২০ ১৫:৫২:৩১
প্রিন্টঅ-অ+


দাওয়াত ও তাবলিগের সবচেয়ে বড় অনুষ্ঠানের নাম বিশ্ব ইজতেমা। কালক্রমে লালসবুজের এই বাংলার বিশ্ব ইজতেমার আবেদন ছড়িয়ে পড়েছে বিশ্বময়। মুসলিম বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম এই সমাবেশ টঙ্গীর তুরাগ তীরকে করে তোলে লোকেলোকারণ্য। পরস্পর ভালোবাসা ও হৃদ্যতার সমাবেশ আর দ্বিতীয়টি নেই এ দেশে। তাই বিশ্ব ইজতেমা সব বাংলাদেশিরই সম্মান ও গৌরবের বিষয়।

আমাদের প্রিয়নবী হজরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মত ও পথের ওপর আহŸান করাই হলো তাবলিগ জামায়াতের কাজ। এই দলবদ্ধভাবে দাওয়াতের প্রক্রিয়া নবীজীর যুগেও ছিল। বিশ্বময় আল্লাহর দ্বীনের এই আহ্বানকে পৌঁছে দেওয়ার জন্য অসংখ্য দায়ী’ বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় দাওয়াতের কাজ করেছেন। তবে ভারতবর্ষের বিশ্বখ্যাত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান দারুল উলূম দেওবন্দের সন্তান ১৮৮৫ সালে জন্ম নেওয়া সাধক মাওলানা ইলিয়াস কান্ধলভী রহ. দলবদ্ধভাবে মানুষের কাছে দ্বীন প্রচারে এই তাবলিগ জামায়াতের শুভসূচনা করেন।

১৩৪৫ হিজরীতে দ্বিতীয় হজ থেকে ফিরে এসে হজরত ইলিয়াস রহ. মেওয়াতে দ্বীন প্রচারের কাজ শুরু করেন। তিনি প্রথমে দাওয়াতি কাজ করার জন্য দিল্লির দক্ষিণে অবস্থিত মেওয়াতকে বেছে নিয়েছিলেন। অশিক্ষা আর সবধরনের কুসংস্কারে আচ্ছন্ন ছিল মুসলমান মেও জনগোষ্ঠী। ১৩৫২ হিজরিতে তৃতীয় হজব্রত করে এসে তিনি আরও বেশি মেও মুসলমানদের দাওয়াত দেওয়ার প্রতি মনোযোগী হলেন। প্রথম তো কেউই তার দাওয়াত গ্রহণ করছিলো না।

উল্লেখ্য, প্রথম ইজতেমা ১৯৪১ সালে দিল্লির নিযামউদ্দীন মসজিদের ছোট এলাকা মেওয়ার নূহ মাদরাসায় আয়োজন করা হয়। এ ইজতেমায় প্রায় ২৫০০০ তাবলিগ দ্বীনদার মুসলমান অংশগ্রহণ করেন। এরপর মাওলানা ইলিয়াস আখতার কান্ধলভীর রহ. নির্দেশে সর্বপ্রথম বাংলাদেশে তাবলিগ জামাতের মেহনত শুরু হয় ১৯৪৪ সালে হজরত মাওলানা আব্দুল আযীযের রহ. মাধ্যমে। কেউ কেউ বলেন, লটারির ভিত্তিতে বিশ্ব ইজতেমা আয়োজনের সুযোগ পায় বাংলাদেশ। প্রথম ইজতেমা ১৯৪৬ সালে ঢাকার কাকরাইল মসজিদে অনুষ্ঠিত হয়। এরপর ১৯৪৮ সালে চট্টগ্রামে তখনকার হাজী ক্যাম্পে এবং ১৯৫৮ সালে বর্তমান নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জে ইজতেমা অনুষ্ঠিত হয়। আশাতীতভাবে ইজতেমাগামী মুসল্লির সংখ্যা বাড়তে থাকায় ১৯৬৬ সালে ইজতেমা টঙ্গীর পাগার গ্রামের খোলা মাঠে আয়োজন করা হয়। ১৯৬৬ সালেই আয়োজনটি বিশ্ব ইজতেমা হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। কারণ, এতে অসংখ্য বিদেশি মেহমানও অংশ নিয়েছিলেন।

১৯৬৭ সাল থেকে বর্তমান অবধি ১৬০ একর জায়গার বিশাল খোলা মাঠে অনুষ্ঠিত হচ্ছে বিশ্ব ইজতেমা। দাওয়াত ও তাবলিগকে ইসলাম ও মুসলমানদের জন্য সুদৃঢ় এক ভিত্তির ওপর দাঁড় করিয়ে ১৯৪৪ সালের ১৩ জুলাই ৫৯ বছর বয়সে হযরত ইলিয়াস রহ. আল্লাহর সান্নিধ্যে পরলোকগমন করেন। এভাবেই দ্রুতগতিতে বৃদ্ধি পেতে থাকে তাবলিগের কাজ। সাধারণ মানুষ দ্বীনধর্ম শেখার এই চমৎকার ভ্রাম্যমাণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে আপন করে নেয়। কারণ, গত শতকে বয়স্ক মাদরাসার চিন্তাই করা যেতো না। আর সেই কারণেই তাবলিগের আবেদন বাড়তে থাকে।

২০১৮ সালে বিশ^ তাবলীগ জামায়াতের কাজে শুরু নতুন এক সমস্যা। তাবলীগের দুই পক্ষের রফাদফা হওয়ার আগেই দেশের প্রতিনিধিত্বশীল মিডিয়ায় ইজতেমা স্থগিত হিসেবে যে প্রচার দেয়া হয়েছে তাতে অস্বস্তিতে পড়ে যায় দেশের শীর্ষ আলেমগণ। তারা এই শান্তিপূর্ণ ইজতেমাকে কোনোভাবেই স্থগিত হিসেবে দেখতে চায় না। তখন ছিলো সামনে জাতীয় একাদশ নির্বাচন- তা সত্য। নির্বাচনের কারণে তারিখ রদবদল হতে পারে। কিন্তু সে বছর বিশ^ ইজতেমা স্থগিত হিসেবে গণমাধ্যমে প্রকাশিত এই খবরের অন্তত কোনো সত্যতা মিলেনি। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ও এ বিষয় নাখোশ বলে জানা গেছে।

তখন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত বৈঠকে তাবলিগ জামাতের চলমান সংকট নিরসন ও পূর্বের স্বাভাবিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে বাংলাদেশের আলেম ও বিশিষ্ট ব্যক্তিদের একটি প্রতিনিধি দল আবারও দেওবন্দ যাওয়ার সিদ্ধান্ত গৃহিত হয়। ১৫ নভেম্বর ২০১৮ বৃহস্পতিবার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের অফিসে তাবলিগ বিষয়ক এক বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত হয়। তাবলিগ জামাতের সংকট, বিভিন্ন মারকাজে সাধারণ মুসল্লিদের ওপর হামলা ও আলমী শূরা আর মাওলানা সাদ কান্ধলভীর অনুসারীরা একত্রে বিশ্ব ইজতেমা কি উদযাপন করতে পারবে? এসব বিষয় সামনে রেখে গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।

সবকিছুর পক্ষবিপক্ষ নয়, কে আসবে আর কে আসবে না সেটা বড় নয়- দেশের আলেমজনতার এই সম্মিলনীর স্থগিতাদেশ নিশ্চয়ই ভালো লক্ষণ ছিলো না। বাংলাদেশকে এখন বিশে^ নানা কারণে চিনে। এখনো প্রতিবছর সবচেয়ে বেশি বিদেশি আসে এই ইজতেমাকে উপলক্ষ করে। বাংলাদেশের মান-সম্মানের সঙ্গে এই ইজতেমা যুক্ত। তাই সরকার এবং তাবলীগ ইস্যু নিয়ে যারা কাজ করছেন সহনীয়ভাবে ইজতেমা যাতে হয় সেরকম সিদ্ধান্ত নেওয়ার আহ্বান জানান আলেমগণও।  

দুই পক্ষের দ্বান্দ্বিক সমস্যাকে উসকে দিতেই একটি মহল এ জাতীয় খবর রটিয়েছে বলে বিশ্লেষকগণ বলছেন। সত্যটা হলো, বাংলাদেশের ইমেজের সঙ্গে সম্পৃক্ত এই ইজতেমা নিয়ে কোনো বাকবিতন্ডা নয়। পরে মাওলানা সাদ কান্ধলবী ও আলমী শূরার পক্ষে মাওলানা যুবাইর আহমদ অনুসারীদের আলাদা আলাদা ইজতেমা করার সিদ্ধান্ত হয়। ২০১৯ ও ২০২০ সালে এভাবেই বিশ্ব ইজতেমা অনুষ্ঠিত হয়েছে এবং হচ্ছে।  

ইমান-জাগানিয়া সুর এই বিশ্ব ইজতেমায় পাওয়া যায়। কত ঢল নামে, উজান থেকে ভাটিতে। কত পসরা বসে, কত কোলাহল দেখা যায়, শীতের আবহে কত লাল সালুর উন্মত্ততা চোখে কোথাও তো এ রকম ইমান-জাগানিয়া সুর নেই, ইমান-জাগানিয়া ব্যঞ্জনা নেই। নেই প্রভুর প্রেমে আচ্ছন্ন প্রতিটি মুহূর্ত কাটাবার বিনম্র পদক্ষেপ।

টঙ্গীর দিকে যেই ঢল নেমেছে, অবরোধ আর সব বাধা উপেক্ষা করে, তা তো নিতান্তই ইমান-জাগানিয়া কিছু স্বপ্নচারী মানুষের সরল-সতেজ এগিয়ে চলা। পবিত্র কাবার পথযাত্রীদের দেখেছি, এহরামের কাপড় পরার সঙ্গে সঙ্গে কেমন যেন একটা সৌম্য-কান্তিময় পরিবর্তন চেহারায় পরিস্ফুটিত হয়, প্রতিবিম্বিত হয়। আশপাশ যেন আলোকিত করে। বিশ্ব ইজতেমায় আগত একটা মানুষের মনেও সুতীব্র পরিবর্তন অনুভব করা যায়। মাথায় টুপি আর পাঞ্জাবি পরে নিজেকে অন্য একটা আবহে চিত্রিত করার অদম্য চেষ্টা সহজেই চোখে পড়ে। নিজেকে পরিবর্তন করতে চায় মুমিন। লাখো মানুষের ঢলে হারিয়ে ফিরে পেতে চায় নিজের ইমান। ইমান-জাগানিয়া কিছু রসদ হাসিলের প্রতিনিয়ত চেষ্টায় বিভোর থাকে মুমিন। এটা তাকে দেখলেই বোঝা যায়। তার সঙ্গে কথা বললেই আরও সহজে অনুমিত হয়। দয়ার্দ্র আর বিনয়ের যে শিক্ষা ইজতেমাগামী তারুণ্যে সেটা পরিলক্ষিত হয়।

দূরদিগন্তে টুপিতে কাউকে বাসের ছাদের উপর দেখলেই আল্লাহু আকবার বলে চিৎকার করে ওঠে। কী এক অপরূপ ভালোবাসা আর প্রেমময়তার আহ্বান সবার চোখে-মুখে। ইমান-জাগানিয়া অব্যক্ত মধুরতা।

মুমিনের তৃপ্তিময়তা কোথায়? কোথায় মহান প্রভুর ভালোবাসার পসরা? কোথায় রাব্বুল আলামিনের আলোকিত মুমিনদের কাফেলার পদযাত্রা? সেখানেই মুমিন নিজেকে বিলীন করতে চায়। নিজেকে আল্লাহপ্রেমে আহ্লাদিত মুমিনের কাতারে সারিবদ্ধ দেখতে চায়। লাখো মানুষের ঢলে তাই মুমিন কাঁচুমাচু করে সেই আল্লাহর স্মরণে থাকে মশগুল, ব্যাপ্ত। এ কারণেই লাখো মানুষের ঢলেও মুমিন প্রভুর স্মরণ থেকে বিস্মৃত হয় না।

লেখক : সহকারী সম্পাদক, দৈনিক আমার বার্তা



আমার বার্তা/১৪ জানুয়ারি ২০২০/জহির







 


আরো পড়ুন