শিরোনাম :

  • নয়াপল্টনে বিএনপির নেতাকর্মীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ জবানবন্দিতে বুলুসহ ১৫ বিএনপি নেতার নাম পেয়েছে পুলিশ সেনা অভ্যুত্থানবিরোধী বিক্ষোভে উত্তাল সুদান, সংঘর্ষে নিহত ৭দুই ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষ, নিহত ২
মুফতি আনিছুর রহমান
ইসলামে মাতৃভাষার মূল্যায়ন
২৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২২ ২০:৩৮:৩৫
প্রিন্টঅ-অ+

মহান আল্লাহ মানুষ সৃষ্টি করার পরে মৌলিক যে সকল নেয়ামত দান করেছেন, তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য একটি অকৃপণ দান হলো ভাষা। ভাষা মনুষ্য পরিচয়ের প্রধান বৈশিষ্ট্য। ইসলাম সব ভাষাকে সম্মান করতে শেখায়; কারণ, সব ভাষাই আল্লাহর দান ও তাঁর কুদরতের নিদর্শন। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেছেন, ‘আর তাঁর নিদর্শনাবলির মধ্যে রয়েছে আকাশম-লী ও পৃথিবীর সৃষ্টি এবং তোমাদের ভাষা ও বর্ণের বৈচিত্র্য। এতে জ্ঞানীদের জন্য অবশ্যই বহু নিদর্শন রয়েছে।’ (সূরা রুম : আয়াত ২২) 


 


প্রত্যেক মানুষের নিজস্ব ভাবপ্রকাশের  ভাষা রয়েছে, তা হলো- মাতৃভাষা। তবে মায়ের মুখের ভাষাই মাতৃভাষা এটা সাধারণ কথা। অন্যভাবে বলা যায়, শিশু যে দেশে জন্মগ্রহণ করে,যে দেশের ভাষা পরিমন্ডলে সে বড় হয়ে উঠে, সে দেশের ভাষাই তার মাতৃভাষা। মাতৃভাষা বা স্বজাতীয় ভাষা এটা নবী-রাসুলদেরও একটি বৈশিষ্ট্য। তাই মাতৃভাষা চর্চা করা ও বিশুদ্ব ভাষায় কথা বলতে শিখা সুন্নাত। 


 


আল্লাহ তাআলা মানুষের হিদায়াতের জন্য নবী-রাসুলদের পাঠিয়েছেন। তাঁদের ধর্ম প্রচারের প্রধান মাধ্যম ছিল দাওয়াত বা মহা সত্যের প্রতি আহ্বান। আর এর জন্য মাতৃভাষার কোনো বিকল্প ছিল না। আল্লাহ তাআলা বলেন, আমি প্রত্যেক রাসুলকেই তার স্বজাতির ভাষাভাষী করে পাঠিয়েছি তাদের কাছে পরিষ্কারভাবে ব্যাখ্যা করার জন্য। (সূরা ইবরাহিম : আয়াত ৪)।


 


মানুষের কাছে ইসলামের দাওয়াত প্রচার ও প্রসারের জন্য যতগুলো মাধ্যম রয়েছে তার মধ্যে বক্তৃতা বা মাধুর্যপুর্ণ ভাষা অন্যতম মাধ্যম। মহান আল্লাহ বলেন: তুমি তোমার রবের পথে আহ্বান জানাও হিকমতের সাথে (সুকৌশলে) এবং উত্তম ভাষণের মাধ্যমে। আর তর্ক করো সর্বোত্তম পন্থায়। (সূরা নাহল : আয়াত ১২৫)


 


রাসূল সা.ইরশাদ করেন, ‘কোনো কোনো ভাষনে রয়েছে যাদু। (বুখারী) তবে যেহেতু সব মানুষ একই পিতামাতা আদম ও হাওয়া আ.-এর সন্তান। অতএব সব মানুষ ভাই ভাই, তাদের মধ্যে কোনো ভেদাভেদ নাই। বর্ণবৈষম্য, ভাষাবৈষম্য এবং ভৌগোলিক ও নৃতাত্ত্বিক পার্থক্য মানুষে মানুষে কোনো ভেদাভেদ সৃষ্টি করে না। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ তাআলা বলেছেন: ‘হে মানুষ! আমি তোমাদের সৃষ্টি করেছি এক পুরুষ ও এক নারী হতে, আর তোমাদের বিভক্ত করেছি বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে, যাতে তোমরা একে অন্যের সঙ্গে পরিচিত হতে পারো। তোমাদের মধ্যে আল্লাহর কাছে সেই ব্যক্তিই বেশি মর্যাদাসম্পন্ন, যে তোমাদের মধ্যে অধিক মুত্তাকি। নিশ্চয়ই আল্লাহ সবকিছু জানেন, সব খবর রাখেন।’ (সূরা হুজুরাত : আয়াত ১৩)।


 


ইসলাম মানুষকে বিভিন্ন ভাষাচর্চায় দারুণভাবে উৎসাহিত করে ও বিশেষ অনুপ্রেরণা জোগায়। ইসলাম মাতৃভাষার উৎকর্ষ সাধনে যথাযথ গুরুত্বারোপ করেছে। কোরআনে কারিমের বিভিন্ন আয়াতে ভাষাচর্চার প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে। কোরআনে কারিমের নাজিলকৃত প্রথম আয়াত ‘ইকরা’য় জ্ঞানার্জনের জন্য মানবজাতির প্রতি উদাত্ত আহ্বান রয়েছে।


এ ছাড়াও আল্লাহতায়ালা প্রত্যেক জাতির স্বীয় মাতৃভাষাকে যথাযথ মর্যাদা প্রদান করে নিজ নিজ জাতির নিজস্ব ভাষায় আসমানি কিতাবগুলো নাজিল করেছেন। এবং শেষ নবী হজরত রাসূলুল্লাহ সা.-এর প্রতি ‘কোরআনে কারিম’ আরবি ভাষায় নাজিল হয়। হজরত রাসূলুল্লাহ সা.-এর মাতৃভাষা ছিল আরবি। হজরত রাসূলুল্লাহ সা.-এর মাতৃভাষায় কোরআন নাজিল হওয়া প্রসঙ্গে আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘আমি কোরআনকে তোমার ভাষায় সহজ করে দিয়েছি, যাতে তুমি তা দিয়ে মুত্তাকিদের সুসংবাদ দিতে পার এবং কলহকারী সম্প্রদায়কে সতর্ক করতে পার। ’ (সূরা মরিয়ম : ৯৭)


 


পৃথিবীতে মানব সংখ্যা বৃদ্ধি হতে থাকলো, বাড়তে থাকলো সমাজ ও রাষ্ট্র। অঞ্চল বেধে মানুষের শিক্ষাদীক্ষার পদ্ধতি, আচার-কালচার সবকিছুতেই নতুন নতুন বিষয়ের আগমন ঘটতে শুরু করলো। সে সূত্র ধরে আমরা হলাম "বাংগালীৃ আমাদের মাতৃভাষা হলো‘ বাংলা, বাংলা ভাষার ব্যবহার, পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে থাকলেও  আমাদের জন্য স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য ও ছিনিয়ে আনা এক অনন্য অধিকার।


 


তৎকালীন পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠি আমাদের ভাষার অধিকার কেড়ে নিতে চেয়েছিল। মরিয়া হয়ে উঠেছিল উর্দূকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে চাপিয়ে দিতে। তাদের এই অপপ্রয়াসের বিরুদ্ধে বাংলাভাষাভাষীরা গড়ে তুলেন তীব্র আন্দোলন। বাংলার আবাল-বৃদ্ধ-বণিতা মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষার লড়াইয়ে ঝাপিয়ে পড়ে। “রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই” স্লোগানে মুখরিত করে তুলেন রাজপথ। এই দূর্বার আন্দোলনে শামিল হয়ে মায়ের ভাষার জন্য বুকের তাজা রক্ত উৎসর্গ করেন এদেশের বহু ছাত্র-জনতা।  


১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষার জন্য বাকস্বাধীনতা ও নিজ ভাষায় কথা বলার অধিকারের জন্য প্রাণ দেয় এদেশের সূর্য সন্তান সালাম,বরকত, রফিক ও জাব্বারদের মতো একদল দেশপ্রেমী মর্দে মুজাহিদ এবং নিরস্ত্র ছাত্র-জনতা।


 


পৃথিবীর ইতিহাসে একমাত্র আমরাই মাতৃভাষার জন্য রক্ত ও জীবন দিয়েছি। তাই ২১ ফেব্রুয়ারি দিনটি আমাদের “ভাষাশহীদ দিবস” এবং বর্তমানে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসেবে পালিত হচ্ছে সারা বিশ্বে। অতএব আমাদের সবার জন্য আবশ্যক ঐসব ত্যাগী বীরশ্রেষ্ঠদের জন্য কল্যাণ কামনা করা এবং ধর্ম বর্ণের ভেদাভেদ ভুলে গিয়ে মা, মাতৃভূমি ও মাতৃভাষাকে ভালোবাসা, প্রিয়  মাতৃভূমিকে সর্বপ্রকার ষড়যন্ত্রের কবল থেকে বাঁচিয়ে রাখার সর্বাত্মক চেষ্টা অব্যাহত রাখা। আল্লাহ তাআলা কবুল করুন।


লেখক : গবেষক, ইমাম ও খতীব 


 

আরো পড়ুন