শিরোনাম :

  • নয়াপল্টনে বিএনপির নেতাকর্মীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ জবানবন্দিতে বুলুসহ ১৫ বিএনপি নেতার নাম পেয়েছে পুলিশ সেনা অভ্যুত্থানবিরোধী বিক্ষোভে উত্তাল সুদান, সংঘর্ষে নিহত ৭দুই ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষ, নিহত ২
ড. আ ফ ম খালিদ হোসেন
ঈদ : মুসলমানদের জাতীয় উৎসব
২৮ এপ্রিল, ২০২২ ২১:৩১:৫২
প্রিন্টঅ-অ+

পৃথিবী বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর নিজস্ব উৎসব রয়েছে কারণ উৎসবের মাধ্যমে প্রাণের সজীবতা অক্ষুণœ থাকে এবং মানুষ খুঁজে পায় জীবন সাধনার সিদ্ধি। আর মুসলমানদের জাতীয় উৎসব হলো ঈদ। ঈদ মানে আনন্দ ও সুখের বারতা। ঈদ মুসলমানদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব। প্রতি বছর প্রতিটি মুসলমানের ঘরে এ বারতা আসে। রমযানের রোযার শেষে খুশীর ঈদ ঈদুল ফিতর। একজন রোযাদার রমযানের এক মাস সিয়াম সাধনার মধ্য দিয়ে কৃচ্ছতা, সংযম, ধৈর্য ও মানবিক মূল্যবোধের প্রশিক্ষণ লাভ করে তারই মূল্যায়নের দিন হলো ঈদুল ফিতর। রোযা মানুষের মনে উদারতা, সহমর্মিতা ও মানবপ্রীতি কতটা জাগিয়ে তুলতে পেরেছে তার প্রমাণ পাওয়া যায় ঈদের দিনে। ঈদের নামাযে ধনী-নির্ধন, ইতর-ভদ্র, ছোট-বড় সব মানুষ যখন একই সমতলে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দাঁড়ায় ও ভক্তিভরে মহান আল্লাহ তা‘য়ালার দরবারে কল্যাণ ও শান্তির জন্য প্রার্থনা করে তখন এক অপূর্ব দৃশ্যের অবতারণা হয়। ঈদগাহ হয়ে উঠে সামাজিক মিলন মেলা। বছরে অন্তত ঈদের দিনে মানুষ সব ক্ষুদ্রতা, সংকীর্ণতা, তুচ্ছতা, হিংসা ও বিদ্বেষ ভুলে পরস্পরকে ভালবাসে। পারস্পরিক কুশল বিনিময়ের মাধ্যমে সর্বস্তরের মানুষের মধ্যে সামাজিক ঐক্য ও সংহতির সৃষ্টি হয়। মুসলমানদের জীবনধারায় এর মূল্য বিশাল। 


রমযানের রোযা তথা সেহেরী, তারবীহ ও ইফতার যারা যথাযথভাবে পালন করেছেন; পাপাচার ত্যাগ করার প্রশিক্ষণ নিয়েছেন, ঈদের আনন্দ তাদের জন্য; অপর দিকে যারা ইচ্ছাকৃতভাবে রোযা ছেড়ে দিয়েছে, দিনের বেলা পানাহার ও যৌন পরিচর্যায় লিপ্ত হয়েছে, তাদের জন্য ঈদ হলো দুঃখ ও হতাশার। ঝলমলে ও সুবাসিত নতুন জামা গায়ে দিলেও তাদের প্রাপ্তির ভান্ডার শুন্য। প্রবৃত্তির প্ররোচনাকে দমন করে যারা বিবেকের শক্তিকে জাগ্রত করতে পেরেছেন রমযান মাসে, ঈদের দিন আল্লাহ তা‘য়ালা তাদের ক্ষমা করে দেন। ঈদের দিনে রোযাদারদের জন্য এটা বিরাট প্রাপ্তি। 


ঈদের দিনে বড়-ছোট সমাজের সব সদস্য নতুন জামা পড়ে বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়-স্বজন ও পাড়া-পড়শীদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে সালাম, কোলাকুলি ও শুভেচ্ছা বিনিময় করে থাকে। ঈদের দিনে ঘরে ঘরে সেমাই, পোলাও, বিরিয়ানি, পায়েসসহ নানা সুস্বাদু খাবার তৈরী হয়ে থাকে। ঈদের দিনে শুধু নিজে ভাল খেলে ও ভাল পরলে ঈদের আনন্দ সম্পূর্ণ হয় না, অন্যদের খাওয়া পরার সুযোগ করে দিতে হবে। সুস্বাদু খাবার কেউ একা খায় না- সবাইকে খাইয়ে আমরা আনন্দ ও তৃপ্তি লাভ করবো। যার দান করার বা খাওয়ানোর সামর্থ নেই, সে মিষ্টি কথা বলে, স্নেহ-মমতা ও সহানুভূতি দেখিয়ে সবাইকে খুশী করা উচিৎ। এটাই ঈদের দিনের বিধান ও কর্তব্য। এর ফলে পরস্পর শত্রুতাভাব বিদুরিত হয়ে সমাজের সদস্যদের মাঝে ভ্রাতৃত্বভাব জেগে ঊঠবে। ত্যাগের মাধ্যমে মানুষ মানুষের ভালবাসা পায় এবং জীবন অমরত্ব লাভ করে। 


দীর্ঘ এক মাস সিয়াম সাধনার পর ঈদের পূর্বে দরিদ্র ও অভাবগ্রস্ত মানুষকে ফিতরা দান করা আর্থিকভাবে স্বচ্ছল প্রতিটি রোযাদারের উপর ওয়াজিব। পবিত্র কুরআনের নির্দেশ অনুযায়ী ফিতরা সমাজের আট শ্রেণীর মানুষের মধ্যে বণ্টন করা হয়। নির্দিষ্ট হারে ফিতরা দানের ফলে সমাজের দারিদ্র্যক্লিষ্ট মানুষের আর্থিক কল্যাণ সাধিত হয়। ফিতরা হচ্ছে দুনিয়া-আখিরাত এবং ব্যক্তি-সমাজের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখার উৎকৃষ্ট উদাহরণ। ফিতরার প্রধান উদ্দেশ্য দু’টি। ১. সমাজের দরিদ্র জনগোষ্ঠী যাতে অপরাপর মুসলমানদের সাথে ঈদের আনন্দে শরীক হতে পারে। ২. রোযা পালনে সতর্কতা সত্ত্বেও যেসব ত্রুটি-বিচ্যুতি হয়ে যায়, যেন তার প্রতিবিধান হয়। মাস ব্যাপী পরিচালিত কঠোর সাধনায় রিপু ও কুপ্রবৃত্তিগুলোকে অবদমন করে যারা জয়ী হতে পেরেছেন, ঈদ তাদের জয়ের উৎসব। 


ঈদ উৎসবের মূলবাণী হচ্ছে মানুষে মানুষে ভালবাসা, সকলের মাঝে একতা ও শান্তি, ভোগে নয়, ত্যাগেই সুখ- ঈদ একথা মনে করিয়ে দেয়। ঈদ নিছক উৎসব নয়, একটি গভীর অর্থ নিহিত আছে ঈদে। ঈদের মধ্যে সমাজ, ইতিহাস, সংস্কৃতি ও মানুষে মানুষে সম্পর্কের উপাদান লুকিয়ে আছে। ঈদ আমাদের সামাজিক চেতনার আনন্দ মুখর অভিব্যক্তি ও জাতীয় সংস্কৃতির অন্যতম প্রাণপ্রবাহ।


এ কথা আমাদের সকলের মনে রাখা দরকার ঈদ মুসলমানদের ধর্মীয় অনুষ্ঠান। ধর্ম পালনের মধ্য দিয়ে কেমন করে পবিত্র ও নির্মল আনন্দ পাওয়া যায়, সে শিক্ষা পাওয়া যায় ঈদ উৎসবে। নিছক আমোদ-প্রমোদ, হৈ হুল্লুড়, পানাহার, নাচ-গান প্রভৃতি এ উৎসবের লক্ষ্য নয়। আনন্দ ও উৎসবের আতিশয্যে যেন ধর্মীয় ভাব গাম্ভীর্য ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সে দিকে লক্ষ্য রাখা প্রয়োজন।


লেখক : গবেষক ও কথাসাহিত্যিক


 

আরো পড়ুন