শিরোনাম :

  • নয়াপল্টনে বিএনপির নেতাকর্মীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ জবানবন্দিতে বুলুসহ ১৫ বিএনপি নেতার নাম পেয়েছে পুলিশ সেনা অভ্যুত্থানবিরোধী বিক্ষোভে উত্তাল সুদান, সংঘর্ষে নিহত ৭দুই ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষ, নিহত ২
বাংলাদেশের নরম মাটিতে
ভূমিকম্প প্রতিরোধী মোড়ানো বাঁধের উদ্ভাবন
নিজস্ব প্রতিবেদক
২৬ জুন, ২০২১ ১৭:৫৫:০৮
প্রিন্টঅ-অ+


বাংলাদেশের মতো নদীবিধৌত অঞ্চলের নরম মাটিতে মোড়ানো বাঁধ ভূমিকম্পে কী রকম আচরণ করবে, তা একটি গবেষণায় উদ্ভাবিত হয়েছে। মোড়ানো বাঁধ মূলত Geotextile দ্বারা মোড়ানো বালুর বাঁধ, যা খাড়াভাবে তৈরি করা হয়। বর্তমানে প্রচলিত বাঁধের দুই পাশে ঢালু করে তৈরি করা হয়। যে কারণে বাঁধ তৈরিতে অনেক জায়গার প্রয়োজন পড়ে। কিন্তু মোড়ানো বাঁধে সেক্ষেত্রে ৭০ শতাংশ পর্যন্ত কম জায়গা লাগবে। এতে করে খরচও অনেক কমে আসবে। সম্প্রতি ড. রিপন হোড় গবেষণা কাজটি পরিচালনা করেন। তিনি বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের পিএইচডি গবেষণা সম্পন্ন করা সাবেক শিক্ষার্থী এবং বর্তমানে এলজিইডিতে সিনিয়র সহকারী প্রকৌশলী হিসেবে কর্মরত।

ড. রিপন হোড় বলেন, আমার গবেষণার মূল উদ্দেশ্য ছিল ভূমিকম্প নরম মাটির ওপর মোড়ানো বাঁধের গতিশীল আচণ বিশ্লেষণ করে এমন এক ধরনের বাঁধ নির্মাণ করা, যা ভ‚মিকম্প প্রতিরোধী হবে এবং প্রচলিত বাঁধের তুলনায় কম খরচে নির্মাণ করা সম্ভব হবে। পাশাপাশি এটি নির্মাণে কম জায়গার প্রয়োজন হবে। বাংলাদেশের নরম মাটিতে মোড়ানো বাঁধ ভূমিকম্প কী রকম আচরণ করবে, সেটা পূর্বে জানা ছিল না। ফলে এ ধরনের মোড়ানো বাঁধ ডিজাইন ও স্পেসিফিকেশন অনুসারে নির্মাণ করা সম্ভব হচ্ছিল না। আমার এ গবেষণায় উদ্ভাবিত বাংলাদেশের নরম মাটিতে মোড়ানো বাঁধের গতিশীল আচরণ উদ্ভাবন এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করল। এখন বাংলাদেশের নরম মাটিতে এ ধরনের মোড়ানো বাঁধ ডিজাইন অনুসারে নির্মাণ করতে আর কোনো সমস্যা থাকল না। ফলে মোড়ানো বাঁধ নির্মাণের মাধ্যমে বাংলাদেশ সরকারের ব্যাপক জমি অধিগ্রহণ ব্যয় হ্রাস করবে। এমনকি এ পদ্ধতি প্রয়োগ করা হলে সড়ক ও জনপথসহ অন্যসব নির্মাণকাজের আওতাভুক্ত ভূমি অধিগ্রহণে ব্যয় বিশালাংশে কমিয়ে নিয়ে আনা সম্ভব হবে।

ড. রিপন হোড় তার গবেষণার ফলে দেখিয়েছেন, প্রচলিত পদ্ধতিতে বাঁধ নির্মাণে যে পরিমাণ ভূমির প্রয়োজন হয়ে থাকে, এ নতুন পদ্ধতিতে বাঁধ নির্মাণ করা হলে প্রায় ৭০ ভাগ কম ভূমি প্রয়োজন। গবেষণায় তিনি মাটির নমুনার ওপর মোড়ানো বাঁধের মডেল প্রস্তুত করে শেক টেবিল টেস্টের সাহায্যে পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে ভূকম্পন চালনা করলে এর ওপর কী কী প্রতিক্রিয়া হতে পারে, সেটি পরীক্ষা করেন এবং প্ল্যাক্সিস থ্রিডি (PLAXIS 3D) নামক এক টু-মডেলিং সফটওয়্যারে এ কাজকে সিমুলেশনের মাধ্যমে পরবর্তী যাচাই ও নিরীক্ষা করেন। এ পরীক্ষার জন্য প্রথমে মোড়ানো বাঁধের একটি প্রোটোটাইপ মডেল প্রস্তুত করা হয়েছে, যেখানে দুটি ভিন্ন ধরনের মাটি (কাদামাটি, বালু) ব্যবহার করা হয়েছে। এ গবেষণার ফল পরবর্তী সময়ে এলজিইডি, সড়ক ও জনপথ বিভাগসহ রেলওয়ে এবং অন্যান্য বিভাগেও যেসব পূর্ত কাজ হয়ে থাকে, সেগুলোর ডিজাইনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. মেহেদী আহমেদ আনসারী বলেন, ‘বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো একটি দেশ, যেখানে অর্থনৈতিক অনেক সীমাবদ্ধতা রয়েছে। এক্ষেত্রে এ পদ্ধতির প্রয়োগের মাধ্যমে আমরা একদিকে যেমন ভূমিকম্পের বিপরীতে শক্তিশালী অবকাঠামো গড়ে তুলতে পারব, একইভাবে স্বল্প পরিমাণে ভূমি অধিগ্রহণ করে ব্যয়ও কমিয়ে নিয়ে আসতে সক্ষম হব। এরকম একটি পদ্ধতির বাস্তবায়ন আমাদের জন্য আশীর্বাদ বয়ে নিয়ে আসবে। কোনো প্রকল্পের ভূমি অধিগ্রহণ ব্যয় যদি ১০০ কোটি টাকা হয়ে থাকে, যেখানে আমাদের এখন ব্যয় হবে মাত্র ৩০ কোটি টাকা। এ পদ্ধতি ইতোমধ্যে জাপানসহ অন্য দেশগুলোয় বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।’

এ প্রসঙ্গে ড. রিপন হোড় জানান, আমাদের দেশে সড়ক অবকাঠামো নির্মাণে ভূমিকম্পের ফলে মাটির গতিশীল আচরণ বিবেচনায় রেখে ডিজাইন করা হয় না। এগুলো ডিজাইন করা হয় স্থির ওজন বিবেচনায় রেখে, যা ভূমিকম্প কিংবা এ ধরনের যেকোনো দুর্যোগের বিপরীতে নাজুক থাকে।’ তিনি বলেন, ‘নরম মাটির মোড়ানো বাঁধের ওপর ভূকম্পন চালনা করে এর প্রতিক্রিয়া ও ফল নিরূপণকারী কোনো গবেষণা আমাদের দেশে এখন পর্যন্ত হয়নি।’

বিশেষজ্ঞদের কাছ থেকে পাওয়া উপাত্ত অনুযায়ী, অতিসম্প্রতি সিলেটে চারটি মৃদু ভূমিকম্প অনুভূত হয়েছে, যা আমাদের জন্য সতর্কবার্তা। আমাদের ভ‚মিকম্পের বিষয়ে সব নির্মাণকাজের সময় বিবেচনা রেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত। গবেষক দল ছয় বছর ধরে তিনটি ধারাবাহিক ভিন্ন ভিন্ন পরীক্ষার মাধ্যমে নরম মাটির ওপর মোড়ানো বাঁধের জন্য ভ‚মিকম্পের প্রতিক্রিয়ায় গতিশীল বৈশিষ্ট্য নিরূপণ করেছে। তাদের গবেষণালব্ধ ফল বিভিন্ন দেশের উন্নতমানের জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে।

























 


আরো পড়ুন