
মরক্কোর রাজনীতিতে নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়েছে। দেশটির ইতিহাসে প্রথমবারের মতো একজন নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পেলেন ফাতিমা এজ্জাহরা এল মনসুরি (Fatima Ezzahra El Mansouri)।
গত ২৩ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত সংসদীয় নির্বাচনে তার দল অথেনটিসিটি অ্যান্ড মডার্নিটি পার্টি (PAM) সর্বাধিক আসন পাওয়ার পর ২৯ সেপ্টেম্বর বাদশাহ ষষ্ঠ মোহাম্মদ তাকে সরকারপ্রধান হিসেবে নিয়োগ দেন এবং নতুন সরকার গঠনের দায়িত্ব দেন। তার দল মোট ৩৯৫ টি আসনের মধ্যে ৯৭ টি আসন লাভ করে।
কে এই ফাতিমা এল মনসুরি?
প্রায় ৫০ বছর বয়সী এল মনসুরি পেশায় আইনজীবী। ফ্রান্সের ইউনিভার্সিটি অব মন্টপেলিয়েতে পড়াশোনা করেছেন এবং যুক্তরাষ্ট্রের পেস ইউনিভার্সিটিতেও আইন বিষয়ে শিক্ষা নিয়েছেন। রাজনীতিতে আসার আগে তিনি কাসাব্লাঙ্কায় বাণিজ্যিক ও রিয়েল এস্টেট আইন নিয়ে কাজ করেছেন।
২০০৮ সালে PAM প্রতিষ্ঠার পর থেকেই দলটির সঙ্গে যুক্ত হন তিনি। ২০০৯ সালে প্রথমবার মারাকেশের মেয়র নির্বাচিত হয়ে তিনি শহরটির প্রথম নারী মেয়র হওয়ার নজির সৃষ্টি করেন। ২০২১ সালে আবারও মেয়র নির্বাচিত হন। একই সময় তিনি মরক্কোর জাতীয় ভূখণ্ড পরিকল্পনা, ভূমি পরিকল্পনা, আবাসন ও নগরনীতি বিষয়ক মন্ত্রীর দায়িত্বও পালন করেন।
রাজনীতিতে তার দীর্ঘ অভিজ্ঞতা এবং স্থানীয় সরকার ও নগর উন্নয়ন বিষয়ে কাজের অভিজ্ঞতাই তাকে জাতীয় পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
২৩ সেপ্টেম্বরের নির্বাচনে কী ঘটেছে?
মরক্কোর ৩৯৫ আসনের প্রতিনিধি পরিষদের নির্বাচনে PAM ৯৭টি আসন পেয়ে সর্ববৃহৎ দল হিসেবে আবির্ভূত হয়। ন্যাশনাল র্যালি অব ইন্ডিপেনডেন্টস (RNI) পেয়েছে ৬৬টি এবং ইস্তিকলাল পার্টি পেয়েছে ৬৫টি আসন। ইসলামপন্থী জাস্টিস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টি (PJD) পেয়েছে ৫৪টি আসন।
তবে কোনো দলই এককভাবে সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় ১৯৮ আসনের সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারেনি। ফলে এল মনসুরিকে অন্যান্য দলের সঙ্গে আলোচনা করে জোট সরকার গঠন করতে হবে। তিনি ইতোমধ্যে সরকার গঠন নিয়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আলোচনার প্রস্তুতির কথা জানিয়েছেন।
নির্বাচনের আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক ছিল ভোটার উপস্থিতি। সরকারি ও আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে ভোটার উপস্থিতি ৩৮.০২ শতাংশ, যা ২০২১ সালের প্রায় ৫০ শতাংশের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম। ১৫.৮ মিলিয়ন নিবন্ধিত ভোটারের মধ্যে PAM-এর পক্ষে প্রায় ১ মিলিয়ন ভোট পড়েছে বলে এপি জানিয়েছে।
সামনে বড় চ্যালেঞ্জ
নতুন সরকারের সামনে রয়েছে অর্থনীতি, কর্মসংস্থান, জীবনযাত্রার ব্যয় ও তরুণদের প্রত্যাশা পূরণের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। একই সঙ্গে মরক্কো ২০৩০ সালের ফিফা বিশ্বকাপের সহ-আয়োজক হিসেবে প্রায় ২০ বিলিয়ন ডলারের অবকাঠামো উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে। নতুন সরকারকে স্টেডিয়াম, পরিবহন, পর্যটন ও অন্যান্য অবকাঠামো উন্নয়নের শেষ ধাপ তদারক করতে হবে।
মরক্কোর সংবিধান অনুযায়ী, প্রতিনিধি পরিষদে সর্বাধিক আসন পাওয়া দলের মধ্য থেকে রাজা সরকারপ্রধান নিয়োগ করেন। ২০১১ সালের সাংবিধানিক সংস্কারের পর এই প্রক্রিয়ায় নির্বাচনের ফলাফল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। তবে পররাষ্ট্রনীতি, প্রতিরক্ষা ও আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে বাদশাহর সাংবিধানিক ক্ষমতা বহাল রয়েছে।
ফাতিমা এজ্জাহরা এল মনসুরির নিয়োগ তাই শুধু মরক্কোর সরকার পরিবর্তনের ঘটনা নয়; এটি দেশটির রাজনৈতিক ইতিহাসে নারী নেতৃত্বের একটি নতুন অধ্যায়। এখন তার সামনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো নির্বাচনের ফলাফলের ভিত্তিতে কার্যকর জোট গঠন এবং অর্থনীতি ও তরুণ সমাজের প্রত্যাশা মোকাবিলায় নতুন সরকারের কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা।

