ই-পেপার বুধবার, ০৪ মার্চ ২০২৬, ২০ ফাল্গুন ১৪৩২

শিক্ষা-শিল্প ফাঁক কমাতে কাঠামোগত সংস্কার জরুরি

সাকিফ শামীম:
১৮ ডিসেম্বর ২০২৫, ১৩:১১
আপডেট  : ১৮ ডিসেম্বর ২০২৫, ১৩:১৯

বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা গত এক দশকে বিস্তারের দিক থেকে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে, উচ্চশিক্ষায় ভর্তির হার বেড়েছে এবং প্রাথমিক শিক্ষায় প্রায় সর্বজনীন প্রবেশাধিকার নিশ্চিত হয়েছে। কিন্তু এই সংখ্যাগত অগ্রগতির আড়ালে গুণগত উন্নয়ন, দক্ষতা সৃষ্টির সক্ষমতা এবং শ্রমবাজারের সঙ্গে শিক্ষার বাস্তব সামঞ্জস্য—এই তিনটি মৌলিক সূচকে দেশের অবস্থান এখনও উদ্বেগজনক। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থা বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতাকে “degree-rich but skill-poor” হিসেবে চিহ্নিত করেছে। অর্থাৎ, ডিগ্রির সংখ্যা বাড়লেও কর্মক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় দক্ষতা তৈরি হচ্ছে না। এই প্রতিকূলতা দীর্ঘমেয়াদে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, উৎপাদনশীলতা এবং প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতার জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করছে।

প্রাথমিক শিক্ষায় বাংলাদেশ প্রায় ৯৭ শতাংশ ভর্তি হার ধরে রাখতে পারলেও প্রকৃত শিখনদক্ষতার চিত্র হতাশাজনক। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (BBS) মূল্যায়নে দেখা যায়, তৃতীয় শ্রেণির প্রায় ৪০ শতাংশ শিক্ষার্থী সাধারণ গণিত সমস্যার সমাধান করতে পারে না এবং প্রায় ৩০ শতাংশ শিক্ষার্থী পাঠ্যবস্তুর অর্থ অনুধাবনে ব্যর্থ হয়। এই শিখন ঘাটতি পরবর্তী স্তরে গিয়ে “learning delay”-এ রূপ নেয়, যা শিক্ষার্থীর পুরো শিক্ষাজীবনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।

মাধ্যমিক শিক্ষায় এই সংকট আরও প্রকট। পরীক্ষানির্ভর শিক্ষা ব্যবস্থা, দক্ষ ও প্রশিক্ষিত শিক্ষকের স্বল্পতা এবং বিজ্ঞান ও গণিত শিক্ষার দুর্বল কাঠামোর কারণে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার গড় মানের নিচে অবস্থান করছে। পেশাগত দক্ষতা উন্নয়নভিত্তিক শিক্ষক প্রশিক্ষণ সীমিত হওয়ায় এই স্তর থেকেই শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিশ্লেষণী চিন্তা, সমস্যা সমাধান ও ব্যবহারিক দক্ষতা গড়ে ওঠে না।

উচ্চশিক্ষার চিত্র আরও উদ্বেগজনক। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (UGC) তথ্য অনুযায়ী, গত এক দশকে উচ্চশিক্ষায় ভর্তির হার দ্বিগুণ হলেও গ্র্যাজুয়েট বেকারত্বের হার ১২ থেকে ১৪ শতাংশের মধ্যেই রয়ে গেছে। অর্থাৎ, অধিকসংখ্যক গ্র্যাজুয়েট তৈরি হলেও তারা শ্রমবাজারে কার্যকরভাবে যুক্ত হতে পারছে না। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ (BIDS)-এর গবেষণায় দেখা যায়, প্রায় অর্ধেক গ্র্যাজুয়েট চাকরি পেতে দীর্ঘ সময় নেয়, যার প্রধান কারণ একাডেমিক কারিকুলামের সঙ্গে শিল্পখাতের বাস্তব চাহিদার স্পষ্ট অসামঞ্জস্যতা।

বিশ্বব্যাংকের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বাংলাদেশের অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রম বর্তমান সময়ের তুলনায় প্রায় ৫ থেকে ৮ বছর পিছিয়ে। ফলে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), অটোমেশন, ডেটা অ্যানালিটিক্স ও রোবটিক্সের মতো চতুর্থ শিল্পবিপ্লব-সংশ্লিষ্ট দক্ষতা গড়ে ওঠার সুযোগ সীমিত।

মেডিক্যাল শিক্ষার ক্ষেত্রেও একই ধরনের কাঠামোগত দুর্বলতা লক্ষ্য করা যায়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) এক মূল্যায়নে দেখা যায়, ক্লিনিক্যাল স্কিল ট্রেনিং, গবেষণা অবকাঠামো এবং আধুনিক চিকিৎসা প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষায় বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশের তুলনায় পিছিয়ে। এর ফলে দ্রুত পরিবর্তনশীল স্বাস্থ্যখাতের চাহিদা পূরণে সক্ষম মানবসম্পদ তৈরি হচ্ছে না।

এই দক্ষতা সংকট এখন জাতীয় অর্থনীতির জন্য একটি বড় ঝুঁকিতে পরিণত হয়েছে। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (ILO) ও বিশ্বব্যাংকের যৌথ বিশ্লেষণে দেখা যায়, বাংলাদেশের প্রায় ৩৮ শতাংশ শিল্পপ্রতিষ্ঠান দক্ষ জনবল না পাওয়াকে উৎপাদনশীলতার প্রধান বাধা হিসেবে উল্লেখ করেছে। বিশ্ববিদ্যালয় ও শ্রমবাজারের মধ্যে দূরত্ব, কারিকুলাম হালনাগাদের ধীরগতি, পরীক্ষানির্ভর মূল্যায়ন ব্যবস্থা এবং ব্যবহারিক অভিজ্ঞতার সীমাবদ্ধতাই এই সংকটের মূল কারণ। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ভোকেশনাল শিক্ষার প্রতি সামাজিক নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি। দক্ষিণ এশিয়ায় যেখানে ভোকেশনাল শিক্ষায় গড় ভর্তি হার প্রায় ১৭ শতাংশ, সেখানে বাংলাদেশে তা এখনও ৭ থেকে ৮ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ।

মূল সমস্যা হলো—আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির বদলে ধীরে ধীরে ডিগ্রি উৎপাদনের কাঠামোয় পরিণত হয়েছে। দুর্বল শিখনদক্ষতা, সীমিত শিক্ষক প্রশিক্ষণ, শিল্পখাতের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ পাঠ্যক্রম, গবেষণায় অপ্রতুল বিনিয়োগ এবং ভোকেশনাল ও প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষার অবহেলা—সব মিলিয়ে আমরা এমন এক জনশক্তি তৈরি করছি, যারা ডিগ্রিধারী হলেও শ্রমবাজারে প্রতিযোগিতাহীন।

এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে কয়েকটি কাঠামোগত সংস্কার জরুরি। যেমন, শিক্ষার প্রতিটি স্তরে Outcome-based curriculum চালু করতে হবে, যেখানে মুখস্থনির্ভরতা নয়—দক্ষতা, সমস্যা সমাধান ও প্রয়োগযোগ্য জ্ঞান মূল্যায়িত হবে। পাশাপাশি, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি ডিগ্রি প্রোগ্রামে বাধ্যতামূলক ও কার্যকর ইন্ডাস্ট্রি ইন্টার্নশিপ নিশ্চিত করতে হবে। এছাড়াও, একটি শক্তিশালী Industry–Academia Council গঠন করা যেতে পারে যেনো পাঠ্যক্রম ভবিষ্যৎ শ্রমবাজারের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়। পরিশেষে, ভোকেশনাল শিক্ষাকে মূলধারায় এনে স্কলারশিপ ও কর্মসংস্থানের প্রণোদনা দিতে হবে।

সর্বোপরি, শিক্ষক প্রশিক্ষণের আধুনিকায়ন, গবেষণায় বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ উৎসাহিত করা এবং মেডিক্যাল শিক্ষায় প্রযুক্তিনির্ভর সংস্কার এখন সময়ের দাবি। বাংলাদেশ এখনও জনমিতিক লভ্যাংশের সুবিধা ভোগ করছে, তবে এই সুযোগ চিরস্থায়ী নয়। যদি শিক্ষাকে দক্ষতা-নির্ভর অর্থনৈতিক অবকাঠামো হিসেবে পুনর্গঠন করা যায়, তবে বাংলাদেশ টেকসই উন্নয়ন ও বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় শক্ত অবস্থান তৈরি করতে পারবে। অন্যথায় উচ্চশিক্ষিত বেকারত্ব, উৎপাদনশীলতার স্থবিরতা এবং দক্ষ জনবল সংকট ভবিষ্যতে আরও বড় অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি করবে।

বাংলাদেশ এখনো জনমিতিক লভ্যাংশের গুরুত্বপূর্ণ সময় অতিক্রম করছে, তবে এই সুযোগ দীর্ঘস্থায়ী নয়। শিক্ষা যদি দক্ষতা–নির্ভর অর্থনৈতিক অবকাঠামো হিসেবে পুনর্গঠিত না হয়, তবে উচ্চশিক্ষিত বেকারত্ব, উৎপাদনশীলতার স্থবিরতা এবং দক্ষ জনবলের সংকট ভবিষ্যতে দেশের প্রবৃদ্ধির প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়াবে। সময় এসেছে ডিগ্রিনির্ভরতার গণ্ডি পেরিয়ে ব্যবহারিক জ্ঞান, প্রযুক্তিনির্ভর দক্ষতা ও শিল্প–সমন্বিত শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলার। একটি আধুনিক, দক্ষতা–কেন্দ্রিক এবং বৈশ্বিক মানদণ্ডসম্মত শিক্ষানীতিই পারে বাংলাদেশের জনশক্তিকে সত্যিকারের মানবসম্পদে রূপান্তরিত করতে এবং টেকসই উন্নয়নের পথে দেশকে আরও দৃঢ়ভাবে এগিয়ে নিতে।

লেখক : ম্যানেজিং ডিরেক্টর, ল্যাবএইড ক্যান্সার হাসপাতাল এন্ড সুপার স্পেশালিটি সেন্টার, ডেপুটি ম্যানেজিং ডিরেক্টর, ল্যাবএইড গ্রুপ।

আমার বার্তা/সাকিফ শামীম/এমই

যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েল বনাম ইরান: যুদ্ধের কিনারায় বিশ্ব, কূটনীতির শেষ সুযোগ

মধ্যপ্রাচ্য আবারও এমন এক অগ্নিগর্ভ বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে, যা শুধু একটি আঞ্চলিক সংঘাত নয় বরং

জনগণের হাসি কি ম্লান হতে শুরু করেছে

এশিয়া, ইউরোপ ও আফ্রিকার বিস্তীর্ণ এলাকা নিয়ে অটোম্যান সাম্রাজ্যের রাজত্ব ছিল। বিচ্ছিন্ন কিছু সময়কাল ও

মাদককে ‘না’ বলি: সুন্দর ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ি

একটি উন্নত সমাজ, সমৃদ্ধ অর্থনীতি এবং সুস্থ-সবল প্রজন্মের স্বপ্ন আমাদের সবার। একটি রাষ্ট্রের প্রকৃত শক্তি

পোশাক পরিবর্তনের চেয়ে মানসিকতার পরিবর্তন চায় সাধারণ মানুষ

পোষাক নয় আচরণের পরিবর্তন চায় সাধারণ মানুষ। নতুন করে আবারও পোষাক পরিবর্তন এর দাবি উঠেছে
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

ভারত মহাসাগরে ইরানি যুদ্ধজাহাজ ডুবিয়ে দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র: হেগসেথ

যুক্তরাষ্ট্রে থাকা অবৈধ বাংলাদেশিদের ফিরিয়ে আনা হবে: পররাষ্ট্রমন্ত্রী

১৮ মার্চও ছুটির প্রস্তাব, অনুমোদন হলে ঈদের ছুটি হবে সাতদিন

তিতাস গ্যাস ও সিটি ব্যাংকের মধ্যে অনলাইনে গ্যাস বিল আদায়ে চুক্তি স্বাক্ষর

ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে উপর্যুপরি ছুরিকাঘাতে নারী শিক্ষককে হত্যা

সংসদীয় কর্মকাণ্ড নিয়ে দলীয় এমপি-মন্ত্রীদের ২ দিনের প্রশিক্ষণ দেবে বিএনপি

ঈদের ছুটি একদিন বাড়ানোর দাবি যাত্রীকল্যাণ সমিতির

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক আরও এগিয়ে নিতে চাই: বাণিজ্যমন্ত্রী

কর্মকর্তা অনুপস্থিত, বিধি অনুসারে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস প্রতিমন্ত্রীর

চাঁদাবাজ-অস্ত্রধারীদের তালিকা করে শিগগিরই সারাদেশে অভিযান

৬ সিটি করপোরেশনে প্রশাসক নিয়োগের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে রিট

৫ দিনে শাহজালাল বিমানবন্দরে বাতিল হলো ১৭৩ ফ্লাইট

ইরানের সাবমেরিন-সহ ১৭টি যুদ্ধজাহাজ ধ্বংস করেছে যুক্তরাষ্ট্র

হাসপাতাল থেকে দালালের দৌরাত্ম্য নির্মূল করা হবে: স্বাস্থ্যমন্ত্রী

চাপের মুখে অর্থনীতি, নতুন সরকারের কঠিন চ্যালেঞ্জ

ময়মনসিংহে সড়ক দুর্ঘটনায় ছাত্রদল নেতা নিহত

বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম আরও বাড়ল

কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে কারিগরি শিক্ষা খাতই হবে প্রধান চালিকাশক্তি: শিক্ষামন্ত্রী

দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় সর্বোচ্চ প্রস্তুতির নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর

বার্সার কাছে তিন গোলে হেরেও ১৩ বছর পর ফাইনালে আতলেতিকো