ই-পেপার মঙ্গলবার, ১০ মার্চ ২০২৬, ২৬ ফাল্গুন ১৪৩২

অচল চট্টগ্রাম বন্দর বাঁচান, অর্থনীতি রক্ষা করুন

সাদিয়া সুলতানা রিমি:
০৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১৪:২৫

দেশের আমদানি–রপ্তানি বাণিজ্যের প্রাণকেন্দ্র চট্টগ্রাম বন্দর আজ কার্যত অচল। নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) সংযুক্ত আরব আমিরাতভিত্তিক বন্দর পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান ডিপি ওয়ার্ল্ডের কাছে ইজারা দেওয়ার সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে শ্রমিক–কর্মচারীদের টানা কর্মবিরতিতে থেমে গেছে জাহাজ চলাচল, বন্ধ রয়েছে পণ্য খালাস কার্যক্রম, কনটেইনারে উপচে পড়ছে ইয়ার্ড। দেশের অর্থনীতির জন্য এই পরিস্থিতি শুধু উদ্বেগজনক নয়, বরং তা গভীর সংকেত বহন করছে।

এই অচলাবস্থা কোনো আকস্মিক দুর্ঘটনা নয়। এটি একদিনে তৈরি হয়নি। বরং এটি নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণে তাড়াহুড়া, প্রশাসনিক জেদ, অংশীজনদের সঙ্গে সময়োচিত ও অর্থবহ সংলাপের অভাব এবং আস্থাহীনতার দীর্ঘ প্রক্রিয়ার পরিণতি। চট্টগ্রাম বন্দরকে কেন্দ্র করে যে সংকট আজ দৃশ্যমান, তা মূলত রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত ও শ্রমিক অসন্তোষের সংঘাতে রূপ নিয়েছে যার খেসারত দিচ্ছে পুরো দেশ।

চট্টগ্রাম বন্দর শুধু একটি অবকাঠামো বা প্রশাসনিক ইউনিট নয়। এটি জাতীয় অর্থনীতির শিরা–উপশিরা। দেশের মোট আমদানি–রপ্তানির প্রায় ৯০ শতাংশই এই বন্দরের ওপর নির্ভরশীল। শিল্পকারখানার কাঁচামাল, রপ্তানিযোগ্য পণ্য, নিত্যপ্রয়োজনীয় ভোগ্যপণ্য সবকিছুরই প্রবেশ ও প্রস্থানের প্রধান দ্বার এই বন্দর। ফলে এখানে এক দিনের স্থবিরতাও বহুমাত্রিক ক্ষতির জন্ম দেয়। টানা কয়েক দিনের অচলাবস্থা দেশের রপ্তানি খাতকে, বিশেষ করে তৈরি পোশাক শিল্পকে বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিয়েছে।

বাংলাদেশের অর্থনীতির চালিকাশক্তি হিসেবে পরিচিত তৈরি পোশাক শিল্প সময়ানুবর্তিতার ওপর নির্ভরশীল। নির্ধারিত সময়ে পণ্য জাহাজীকরণ করতে না পারলে বিদেশি ক্রেতাদের কাছে শুধু আর্থিক ক্ষতিই নয়, বিশ্বাসযোগ্যতার সংকটও তৈরি হয়। ক্রয়াদেশ বাতিল, মূল্যছাড়ের চাপ, ভবিষ্যৎ অর্ডার হারানোর আশঙ্কা সব মিলিয়ে এই ক্ষতির হিসাব কেবল কয়েক দিনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; এর প্রভাব দীর্ঘমেয়াদি।

এই সংকটের কেন্দ্রে রয়েছে নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) বিদেশি প্রতিষ্ঠানের কাছে ইজারা দেওয়ার প্রক্রিয়া। সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এটিকে দক্ষতা বৃদ্ধি ও আধুনিক ব্যবস্থাপনার যুক্তিতে ব্যাখ্যা করলেও শ্রমিক–কর্মচারীদের বড় একটি অংশ এটিকে দেখছেন জাতীয় স্বার্থবিরোধী সিদ্ধান্ত হিসেবে। তাদের আশঙ্কা এই ইজারার ফলে কর্মসংস্থান অনিশ্চিত হবে, স্থানীয় সক্ষমতা ও অভিজ্ঞতা উপেক্ষিত হবে এবং ধীরে ধীরে দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বন্দরটির নিয়ন্ত্রণ বিদেশি হাতে চলে যাবে।

এই আশঙ্কা একেবারে অমূলক বলে উড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই। অতীত অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, অপরিকল্পিত বেসরকারিকরণ ও বিদেশি ইজারা অনেক ক্ষেত্রে জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়েছে। অনেক সময় প্রতিশ্রুত বিনিয়োগ, প্রযুক্তি হস্তান্তর কিংবা কর্মসংস্থান সুরক্ষার নিশ্চয়তা বাস্তবে প্রতিফলিত হয়নি। ফলে শ্রমিকদের মধ্যে সন্দেহ, ভীতি ও অনাস্থা তৈরি হওয়াটাই স্বাভাবিক।

কিন্তু সবচেয়ে দুর্ভাগ্যজনক বিষয় হলো, এই উদ্বেগ ও প্রশ্নের জবাবে কর্তৃপক্ষ সংলাপের পথ বেছে নেয়নি। বরং বদলি, হয়রানি ও দমনমূলক প্রশাসনিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। আন্দোলনে যুক্ত শীর্ষ নেতাসহ একাধিক কর্মচারীকে দূরবর্তী বন্দরে বদলি করা হয়েছে। শ্রমিকদের চোখে এটি ছিল শাস্তিমূলক বার্তা এক ধরনের শক্তি প্রদর্শন। এর ফল হিসেবে আন্দোলন আরও তীব্র হয় এবং শেষ পর্যন্ত তা অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতিতে রূপ নেয়।

রাষ্ট্রের দায়িত্ব শুধু অবকাঠামো পরিচালনা নয়; সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের আস্থা রক্ষা করাও রাষ্ট্রের অন্যতম কর্তব্য। এখানে সেই আস্থার জায়গাতেই বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হয়েছে। বন্দর কর্তৃপক্ষ ও নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় যদি আগেভাগেই শ্রমিক প্রতিনিধিদের সঙ্গে খোলামেলা, স্বচ্ছ ও অর্থবহ আলোচনা করত, তাহলে পরিস্থিতি এত দূর গড়াত না। উন্নয়ন মানে কেবল বিদেশি বিনিয়োগ নয়; উন্নয়ন মানে অংশগ্রহণমূলক সিদ্ধান্ত গ্রহণ, স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করা।

এই অচলাবস্থার প্রভাব বন্দর চত্বরে সীমাবদ্ধ নেই। দেশের বিভিন্ন বেসরকারি কনটেইনার ডিপোতে রপ্তানি পণ্যের কনটেইনার জমে পাহাড় তৈরি হয়েছে। অনেক ডিপো ধারণক্ষমতার বাইরে চলে গেছে। আমদানি পণ্য খালাস না হওয়ায় শিল্পকারখানায় কাঁচামালের সংকট তৈরি হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। উৎপাদন ব্যাহত হলে কর্মসংস্থান ও সরবরাহ ব্যবস্থায় তার সরাসরি প্রভাব পড়বে।

অন্যদিকে, জাহাজ চলাচল বন্ধ থাকায় বহির্নোঙরে অপেক্ষমাণ জাহাজগুলোর জন্য প্রতিদিন গুনতে হচ্ছে বিপুল অঙ্কের ডেমারেজ চার্জ। এই অতিরিক্ত খরচ শেষ পর্যন্ত বহন করতে হবে আমদানিকারক–রপ্তানিকারক ও ভোক্তাদের। অর্থাৎ বন্দরের অচলাবস্থা ধীরে ধীরে পুরো অর্থনীতির ওপর চাপ সৃষ্টি করছে।

আরও বড় উদ্বেগের বিষয় হলো, এই সংকট আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করছে। বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থায় নির্ভরযোগ্যতা একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মানদণ্ড। কোনো দেশের বন্দর ব্যবস্থায় বারবার অচলাবস্থা সৃষ্টি হলে বিদেশি ক্রেতা ও বিনিয়োগকারীরা স্বাভাবিকভাবেই বিকল্প উৎস খোঁজার কথা ভাববেন। এটি কেবল একটি মৌসুমের ক্ষতি নয়; এটি দীর্ঘ মেয়াদে বাজার হারানোর ঝুঁকি তৈরি করে।

এই বাস্তবতায় এখনই দায়িত্বশীল সিদ্ধান্ত নেওয়া জরুরি। প্রথমত, আন্দোলনরত শ্রমিক–কর্মচারীদের সঙ্গে অবিলম্বে সংলাপ শুরু করতে হবে। এই সংলাপ হতে হবে আন্তরিক ও ফলপ্রসূ লোক দেখানো নয়। দ্বিতীয়ত, এনসিটি ইজারা প্রক্রিয়া নিয়ে সব তথ্য জনসমক্ষে আনতে হবে কেন এই সিদ্ধান্ত, কী শর্তে, কত মেয়াদে, দেশের কী লাভ হবে, কর্মসংস্থানের কী নিশ্চয়তা রয়েছে। স্বচ্ছতা ছাড়া আস্থা ফিরবে না। তৃতীয়ত, আন্দোলন দমাতে নেওয়া বদলি ও হয়রানিমূলক সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করে পরিস্থিতি শান্ত করার উদ্যোগ নিতে হবে।

চট্টগ্রাম বন্দর কোনো পক্ষের শক্তি প্রদর্শনের মঞ্চ হতে পারে না। এটি জাতীয় স্বার্থের কেন্দ্রবিন্দু। শ্রমিকদের ন্যায্য দাবি উপেক্ষা করে যেমন বন্দর সচল রাখা সম্ভব নয়, তেমনি বন্দর অচল রেখে দাবি আদায়ের পথও দেশকে গভীর ক্ষতির দিকে ঠেলে দেয়। দায়িত্বশীলতা চাই দুই পক্ষেরই। তবে মনে রাখতে হবে, নেতৃত্ব ও সমাধানের ভার শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রের ওপরই বর্তায়।

এই সংকট দীর্ঘায়িত হলে ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার সুযোগ থাকবে না। তখন অর্থনীতি, কর্মসংস্থান ও আন্তর্জাতিক আস্থার ক্ষয় ঠেকানো কঠিন হয়ে পড়বে। তাই এখনই সিদ্ধান্ত নিতে হবে সংঘাত নয়, সংলাপ; জেদ নয়, যুক্তি; দমন নয়, দায়িত্ব।চট্টগ্রাম বন্দরকে বাঁচানো মানেই দেশের অর্থনীতিকে বাঁচানো।

লেখক : শিক্ষার্থী, গণিত বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়।

আমার বার্তা/সাদিয়া সুলতানা রিমি/এমই

মরক্কোর আমাজিঘ নারী: প্রাচীন হস্তশিল্পের মানব জাদুঘর ও ঐতিহ্যের ধারক

মরক্কোর গ্রাম, পাহাড়ি জনপদ, মরুভূমি অঞ্চল ও এর আশেপাশে আমাজিঘ সম্প্রদায়ের নারীরা বসবাস করেন। তারা

ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ: ইতিহাস ও ভূগোলের কঠিন বাস্তবতা

আমেরিকা ও ইসরাইল যৌথভাবে ইরানে আক্রমণ করেছে। এই আক্রমণের ফলে কি ইরান পরাজিত হবে? স্পষ্ট

দুর্যোগ প্রস্তুতিতে লড়বো, তারুণ্যের বাংলাদেশ গড়বো

প্রকৃতির অপার সৌন্দর্যে ভরা বাংলাদেশ একই সঙ্গে প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকিপূর্ণ একটি দেশ। ভৌগোলিক অবস্থান, বিস্তীর্ণ

এসএমই ও স্টার্টআপ বিপ্লব: এফবিসিসিআই-ই হবে প্রবৃদ্ধির নতুন ইঞ্জিন

বাংলাদেশ আজ এক অর্থনৈতিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। আমরা স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা ছাড়িয়ে ২০২৬ সালে এলডিসি উত্তরণের
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

ফ্যামিলি কার্ড নিয়ে দুর্নীতির কোনো সুযোগ নেই: পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী

চরমপন্থিরা পুনরায় অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছে : র‍্যাব

ঈদযাত্রা নির্বিঘ্ন করতে সায়েদাবাদে অবৈধ কাউন্টার উচ্ছেদ করবে ডিএসসিসি

ব্রাহ্মণবাড়ীয়ায় জাতীয় দুর্যোগ প্রস্তুতি দিবস উপলক্ষে অগ্নিকান্ড বিষয়ক মহরা অনুষ্ঠিত

সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান ও তার স্ত্রী বিরুদ্ধে চার্জশিট অনুমোদন

ইরান থেকে ট্রাম্পকে বেরিয়ে আসতে পরামর্শ দিচ্ছেন উপদেষ্টারা

৩ হাজার কোটি টাকার তহবিল ও গৃহঋণে সিঙ্গেল ডিজিট সুদ চান আবাসন ব্যবসায়ীরা

সম্মতি ছাড়া পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে চিঠি, পদ হারালেন জামায়াত আমিরের উপদেষ্টা

ঈদে সংবাদপত্রে ৫ দিনের ছুটি ঘোষণা

ইরানের সরকারপতন নির্ভর করছে সেখানকার জনগণের ওপর: নেতানিয়াহু

ঈদযাত্রা নিরাপদ-নির্বিঘ্ন করতে ঢাকা আহ্ছানিয়া মিশনের ৯ সুপারিশ

কোনো রাজনৈতিক বিবেচনায় ফ্যামিলি কার্ড দেওয়া হয়নি: অর্থ উপদেষ্টা

মরক্কোর আমাজিঘ নারী: প্রাচীন হস্তশিল্পের মানব জাদুঘর ও ঐতিহ্যের ধারক

ঈদের মিছিল ও তিনদিন ঈদ উৎসব আয়োজন করা হবে: আসিফ মাহমুদ

জাবিসাসের সভাপতি মাহ্ আলম, সম্পাদক রাজিব

সরকার নির্বাচনী অঙ্গীকার বাস্তবায়নে দৃঢ়ভাবে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ: বাণিজ্যমন্ত্রী

যুদ্ধ পরিস্থিতিতে সংকট ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা প্রণয়নে মন্ত্রিসভা কমিটি গঠন

জামিনের জন্য কোটি টাকা চাওয়ার ঘটনায় অভ্যন্তরীণ তদন্ত হবে

‘ঐকমত্যের সরকার’ গঠনে সরকারি ও বিরোধী দলীয় চিফ হুইপের বৈঠক

ঈদের আগে ছুটিতে দুদিন পোশাক শিল্প এলাকায় খোলা থাকবে ব্যাংক