
বাংলাদেশের ইতিহাসে কিছু দিন আছে, যেগুলো কেবল ক্যালেন্ডারের তারিখ নয়—একটি জাতির আবেগ, বেদনা ও স্মৃতির অংশ। ১৯৮১ সালের ৩০ মে তেমনই এক দিন। সেই দিনটি শুধু একজন রাষ্ট্রপতির শাহাদাতের দিন নয়; বহু মানুষের কাছে সেটি ছিল স্বাধীন বাংলাদেশে নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও সম্ভাবনাময় জীবনের এক স্বপ্নভঙ্গের দিন।
২০২৬ সালের আজকের দিনটি এক বিশেষ তাৎপর্যময়। কারণ, ঠিক ৪৫ বছর আগে ১৯৮১ সালেও ২৯ মে ছিল শুক্রবার। সেদিন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান চট্টগ্রাম সফরে যান। দুপুরে চকবাজারের ঐতিহাসিক চন্দনপুরা মসজিদে জুমার নামাজ আদায় করেন। পরে সার্কিট হাউসে ফিরে মধ্যাহ্নভোজ সারেন এবং স্থানীয় রাজনৈতিক বিরোধ নিরসনে নেতৃবৃন্দকে নিয়ে দীর্ঘ বৈঠকে বসেন।
কিন্তু সেই সফরই হয়ে ওঠে তাঁর জীবনের শেষ সফর। দিবাগত ৩০ মে ভোররাতে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে সেনাবাহিনীর বিপথগামী কিছু সদস্যের হাতে নির্মমভাবে নিহত ও শহীদ হন বাংলাদেশের প্রথম ও সপ্তম রাষ্ট্রপতি, স্বাধীনতার ঘোষক, মুক্তিযুদ্ধের সেক্টর কমান্ডার এবং বহুদলীয় গণতন্ত্রের প্রবর্তক বীর উত্তম জিয়াউর রহমান।
আজ, ৪৫ বছর পর এসে, একই দিন ও একই তারিখ যেন সেই বেদনাময় স্মৃতিকেই আবার ফিরিয়ে আনে।
জাতির শোক
সেদিন গোটা বাংলাদেশ স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল। ঘরে ঘরে মানুষ কেঁদেছিল। শুধু রাজনৈতিক কর্মী নয়, সাধারণ মানুষও গভীরভাবে শোকাহত হয়েছিল। অনেকে দিনের পর দিন রোজা রেখে তাঁর জন্য দোয়া করেছিলেন।
কেন করেছিলেন?
কারণ তারা বিশ্বাস করতেন—এই মানুষটি তাদের জন্য কাজ করেছিলেন, তাদের জীবন বদলানোর চেষ্টা করেছেন।
আজও স্পষ্ট মনে পড়ে ১৯৮১ সালের সেই শনিবার সকালের কথা। ছুটি চলছিল। খুব ভোরে এক বন্ধুকে সঙ্গে নিয়ে বাজারে গিয়েছিলাম পত্রিকা পড়তে। পথে তালেব হোসেন মুন্সীর দোকানের সামনে হঠাৎ থেমে যাই। রেডিওতে গম্ভীর সুরে কিছু প্রচার হচ্ছিল।
হঠাৎ ঘোষণা এলো—“রাষ্ট্রপতি জিয়া চট্টগ্রামে নিহত।”
মুহূর্তেই চারপাশ স্তব্ধ হয়ে যায়। সবাই একে অপরের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। কেউ যেন বিশ্বাস করতে পারছিল না। এরপর রেডিওতে চলতে থাকে হামদ-নাত, শোকসংগীত। আজও সেই সুর কানে বাজে—শরীর কেঁপে ওঠে।
সেই দিন, সেই সময়, সেই শোক—আজও বিষাদময়।
পরবর্তী দুই-তিন দিন টেলিভিশনের সামনে কেটেছিল। অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির ভাষণ, চট্টগ্রামের সেনা বিদ্রোহ, বিদ্রোহ দমনে নানা পদক্ষেপ, বিদ্রোহীদের পরিচয়, রেডিওযোগে আত্মসমর্পণের আহ্বান—সবই ছিল তখন দেশের মানুষের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে।
দু’দিন পরে ঢাকায় আসে শহীদ রাষ্ট্রপতির কফিন। অনুষ্ঠিত হয় বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম বৃহৎ জানাজা। সারা দেশে নেমে আসে দীর্ঘ শোকের ছায়া। রাষ্ট্রীয়ভাবে পালিত হয় ৪০ দিনের শোক।
সেই হত্যাকাণ্ডকে ঘিরে তখন থেকেই নানা আলোচনা, বিতর্ক ও ষড়যন্ত্রতত্ত্ব ছড়িয়ে পড়ে। দেশি-বিদেশি চক্রান্ত, সামরিক অভ্যন্তরীণ বিরোধ এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতির প্রভাব—সব মিলিয়ে ঘটনাটি বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম আলোচিত রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডে পরিণত হয়।
স্বাধীনতার ঘোষণা ও জিয়ার আবির্ভাব
জিয়াউর রহমান ছিলেন এক ক্ষণজন্মা পুরুষ, যার নেতৃত্বে এ ভূখণ্ডের সাড়ে সাত কোটি মানুষ স্বাধীন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখতে শুরু করে।
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর “অপারেশন সার্চলাইট” শুরু হওয়ার পর পূর্ব পাকিস্তান কার্যত নেতৃত্বশূন্য হয়ে পড়ে। সেই ভয়াল সময়ে অসংখ্য বাঙালি সামরিক কর্মকর্তা থাকলেও প্রকাশ্যে বিদ্রোহ ঘোষণা এবং স্বাধীন বাংলাদেশের ঘোষণা দেওয়ার সাহস দেখিয়েছিলেন মেজর জিয়াউর রহমান।
চট্টগ্রামের ষোলশহরে অবস্থিত অষ্টম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে বিদ্রোহ করে তিনি ঘোষণা দেন—“We Revolt।”
পরে কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে বাংলাদেশকে স্বাধীন ঘোষণা করেন এবং বাঙালি সেনা, পুলিশ, ইপিআর ও সাধারণ জনগণকে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ার আহ্বান জানান। তাঁর আহ্বানে হাজার হাজার বাঙালি যোদ্ধা স্বাধীনতার যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন, এবং নয় মাস যুদ্ধ করে লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে স্বাধীন দেশ লাভ করে।
সেই সময়ের বাস্তবতায় মেজর জিয়ার ঐ ঘোষণা ছিল মুক্তিযুদ্ধের প্রথম সুসংগঠিত সামরিক ও রাজনৈতিক আহ্বান, যা যুদ্ধরত বাঙালি জাতিকে দিকনির্দেশনা দেয়।
আন্তর্জাতিক সূত্রে স্বাধীনতার ঘোষণা
ভারতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত “History of 1971 War” গ্রন্থে উল্লেখ করা হয়েছে যে, স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসের সূচনা ঘটে মেজর জিয়াউর রহমানের ঘোষণার মধ্য দিয়ে। সেখানে তাঁর স্বাধীনতার ঘোষণা এবং অস্থায়ী রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে।
একইভাবে প্রবাসী সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ ১১ এপ্রিলের বেতার ভাষণে বলেন, “People’s Republic of Bangladesh” প্রথম ঘোষণা করেছিলেন মেজর জিয়া রহমান এবং মুক্তাঞ্চলসমূহ সেখান থেকেই পরিচালিত হচ্ছিল।
তাজউদ্দীন আহমদ চট্টগ্রামের প্রতিরোধকে “স্টালিনগ্রাদের যুদ্ধ”-এর সঙ্গে তুলনা করে বলেছিলেন, চট্টগ্রামের প্রতিরোধ না হলে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পথ আরও কঠিন হয়ে যেত।
জাতির সংকটময় মুহূর্তে জিয়ার আবির্ভাব
স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ ভয়াবহ রাজনৈতিক অস্থিরতা, দুর্ভিক্ষ, লুটপাট, খুন-গুম, অর্থনৈতিক বিপর্যয় ও প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলার মধ্যে পড়ে। সাধারণ মানুষের মনে স্বাধীনতার স্বপ্ন অনেকাংশে ম্লান হয়ে যায়।
১৯৭৫ সালের পটপরিবর্তনের পর সেই অস্থির সময়ে রাষ্ট্রক্ষমতায় এসে জিয়াউর রহমান দেশ পুনর্গঠনের কাজে আত্মনিয়োগ করেন।
তাঁর সময়েই শুরু হয় “সবুজ বিপ্লব”—খাল খনন, সেচব্যবস্থা সম্প্রসারণ এবং খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি। “ফুড ফর ওয়ার্ক” কর্মসূচির মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়। গ্রামাঞ্চলে উন্নয়নমূলক কাজ শুরু হয়।
মানুষ দেখতে পায়—
• দুর্ভিক্ষ থেমে গেছে
• আইন-শৃঙ্খলার উন্নতি হচ্ছে
• অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার হচ্ছে
• শিল্পকারখানায় উৎপাদন বাড়ছে
• বিদেশে শ্রমবাজার খুলছে
• পোশাক শিল্পের সূচনা হয়েছে
• যুবকদের কর্মমুখী প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে
• পরিবার পরিকল্পনা কার্যক্রম জোরদার হচ্ছে
• গণশিক্ষা কর্মসূচিতে নিরক্ষর মানুষ সাক্ষর হচ্ছে
রাষ্ট্রপতি জিয়া শুধু অফিস বা রাজধানী কেন্দ্রিক শাসক ছিলেন না। তিনি ছিলেন মাঠের মানুষ। গ্রামবাংলার পথে পথে হেঁটেছেন শত শত মাইল, মানুষের ঘরে গিয়েছেন, তাদের কথা শুনেছেন, তাদের কষ্ট বুঝতে চেয়েছেন। জনগণ প্রথমবারের মতো অনুভব করেছিল—রাষ্ট্র তাদের জীবনমান উন্নয়নে কাজ করছে।
“বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ” ও বহুদলীয় গণতন্ত্র
রাষ্ট্রপতি জিয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক অবদান ছিল “বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ”-এর ধারণা প্রতিষ্ঠা। তিনি ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে এ দেশের সকল নাগরিকের জন্য একটি অভিন্ন জাতীয় পরিচয় প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেন।
একদলীয় শাসনব্যবস্থার অবসান ঘটিয়ে তিনি বহুদলীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রবর্তন করেন। সামরিক আইন প্রত্যাহার, রাজনৈতিক দলগুলোর পুনর্বাসন, সংসদীয় রাজনীতির পুনর্জাগরণ এবং নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণের রাজনৈতিক অধিকার ফিরিয়ে দেন।
আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে জিয়ার বাংলাদেশ
জিয়াউর রহমান আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও বাংলাদেশের মর্যাদা বৃদ্ধি করেন। তিনি জাতিসংঘে বাংলাদেশের অবস্থান সুদৃঢ় করেন, ফারাক্কা ইস্যুতে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক চাপ সৃষ্টি করেন এবং মুসলিম বিশ্ব ও তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক জোরদার করেন।
দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা SAARC প্রতিষ্ঠার সূত্রপাত ঘটান। সক্রিয় ও দূরদর্শী কূটনীতির কারণে তিনি বিশ্বমঞ্চে “রাষ্ট্রনায়ক জিয়া” হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন।
বিদেশি পর্যবেক্ষকদের মূল্যায়ন
মার্কিন প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টার হোয়াইট হাউসে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রপতি জিয়াকে “বাংলাদেশের অত্যন্ত গুণী নেতা” হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, তিনি বাংলাদেশের মানুষের জীবনমান উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন।
বাংলাদেশে নিযুক্ত সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত উইলিয়াম বি. মাইলাম লিখেছিলেন—যদি জিয়াউর রহমান ১৯৮১ সালের পরিবর্তে ১৯৭৫ সালেই নিহত হতেন, তবে বাংলাদেশ আফগানিস্তান বা লাইবেরিয়ার মতো একটি ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত হতে পারত। তাঁর মতে, জিয়া বাংলাদেশকে সেই পরিণতি থেকে রক্ষা করেছিলেন।
জাতীয় সংসদে জিয়ার প্রতি শ্রদ্ধা
জিয়ার শাহাদাতের পর বাংলাদেশের জাতীয় সংসদে শোক প্রস্তাব গৃহীত হয়। সরকার ও বিরোধী দলের নেতারাও তাঁর অবদানের স্বীকৃতি দেন।
তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শাহ আজিজুর রহমান তাঁকে স্বাধীনতার ঘোষক ও বহুদলীয় গণতন্ত্রের প্রবর্তক হিসেবে অভিহিত করেন।
আওয়ামী লীগ নেতা ও বিরোধী দলীয় নেতা আছাদুজ্জামান খান বলেন, “তিনি ২৬ মার্চ স্বাধীনতা ঘোষণা করেছিলেন। জাতি সেটা স্মরণ করবে।”
সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত বলেন, লাখো মানুষের উপস্থিতি প্রমাণ করেছে যে জিয়াউর রহমান সাধারণ মানুষের কতটা প্রিয় ছিলেন। তিনি তাঁর সততা ও দুর্নীতিবিরোধী অবস্থানের প্রশংসা করেন।
মোজাফ্ফর আহমদ তাঁকে “সৎ, দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ও দেশপ্রেমিক” নেতা হিসেবে উল্লেখ করেন।
মোহাম্মদ তোয়াহা বলেন, “He has acquired all the art of leadership”—অর্থাৎ নেতৃত্বের সব গুণ তিনি অর্জন করেছিলেন।
ব্যক্তিগত স্মৃতিতে জিয়া
জীবনে চারবার রাষ্ট্রপতি জিয়াকে কাছ থেকে দেখার সৌভাগ্য হয়েছিল। একবার স্কুলে তাঁর সঙ্গে খাল কেটেছিলাম। কাজ শেষে পাউরুটি আর কলা খেয়েছিলাম। আরেকবার তাঁর সঙ্গে হাত মেলানোর সুযোগ হয়েছিল। একবার জনসভায় মঞ্চে তাঁকে দেখেছি। আরেকবার উপস্থিত ছিলাম ইয়ুথ কমপ্লেক্স উদ্বোধনের অনুষ্ঠানে। আজ মনে হয়—ওই বয়সে এগুলো ছিল অসাধারণ সৌভাগ্য।
আমার রাজনৈতিক ও সামাজিক বোধ গড়ে উঠেছে মূলত জিয়ার সময়কে ঘিরেই। স্বাধীনতার পরের অরাজকতার কথা যেমন ভুলবার নয়, তেমনি জিয়ার আমলে পরিবর্তনের বাস্তব চিত্রও রয়েছে চোখের সামনে। তাই তাঁর সময়টাকে কেবল ইতিহাসের অধ্যায় নয়, নিজের জীবনেরও এক গুরুত্বপূর্ণ অভিজ্ঞতা মনে হয়।
ইতিহাসে অম্লান এক নাম
মৃত্যু জিয়াউর রহমানকে থামিয়ে দিতে পারেনি। তিনি আজও রয়ে গেছেন মানুষের স্মৃতিতে, ইতিহাসের পাতায় এবং বহু মানুষের রাজনৈতিক চেতনায়।
স্বাধীনতার যুদ্ধ থেকে রাষ্ট্র পুনর্গঠন, বহুদলীয় গণতন্ত্র থেকে আন্তর্জাতিক কূটনীতি—বাংলাদেশের ইতিহাসে তাঁর অবদান নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ ও স্মরণীয়।
আজ তাঁর শাহাদাতবার্ষিকীতে গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছি এই রাষ্ট্রনায়ককে। মহান আল্লাহ তাঁর রুহের মাগফিরাত দান করুন এবং তাঁকে জান্নাতুল ফেরদৌস নসিব করুন। আমিন।
লেখক : বিশ্লেষক ও লেখক, সিনিয়র সচিব।

