শিরোনাম :

  • নয়াপল্টনে বিএনপির নেতাকর্মীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ জবানবন্দিতে বুলুসহ ১৫ বিএনপি নেতার নাম পেয়েছে পুলিশ সেনা অভ্যুত্থানবিরোধী বিক্ষোভে উত্তাল সুদান, সংঘর্ষে নিহত ৭দুই ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষ, নিহত ২
ডিএসসিসির একাল-সেকাল পর্ব-৩
পদোন্নতিতে নয়ছয়!
হাসান মাহমুদ রিপন
০৮ নভেম্বর, ২০২১ ২১:৩৯:১৪
প্রিন্টঅ-অ+




ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের (ডিএসসিসি) বর্তমান মেয়রের দায়িত্ব গ্রহণের পূর্বে প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই চলেছে সীমাহীন অনিয়ম আর দুর্নীতি। দায়িত্ব পেয়েই অনিয়ম-দুর্নীতিতে জড়িয়ে অনেকে হয়েছেন কোটি কোটি টাকার মালিক। বর্তমান সময়ে যে দুর্নীতিমুক্ত এমনটা ভাবারও কোনো অবকাশ নেই। ডিএসসিসিতে সম্প্রতি বিভিন্ন পদে পদোন্নতি দিয়ে প্রকাশিত গেজেট প্রকাশের পর শুরু হয় পদোন্নতি দেয়া নিয়ে নয়ছয় হওয়ার নানা গুঞ্জন। তবে বর্তমান মেয়র ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপস দায়িত্ব গ্রহণের পরই ঘোষণা দিয়েছেন দুর্নীতির বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতা নীতির। চলমান এসব ঘটনা নিয়ে প্রস্তুতকৃত ধারাবাহিক প্রতিবেদনের আজ প্রকাশিত হলো তৃতীয় পর্ব।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের (ডিএসসিসি) শেখ ফজলে নূর তাপস মেয়র হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর গত বছর ডিসেম্বর ও চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে বিভিন্ন পদে পদোন্নতি দিয়ে গেজেট প্রকাশ করে। তবে ওইসব পদোন্নতি বিধিবহিভর্‚তভাবে দেয়া হয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। তফসিল অনুযায়ী ফিডারভুক্ত এবং জেষ্ঠ্যতম হলেও এমন প্রার্থীকে উপকর কর্মকর্তা (ডিটিও) পদে পদোন্নতী দেয়া হয়নি বলে অভিযোগে প্রকাশ। জানা যায়, ফিডার পদে ১২ বছর পূর্ণ না হওয়ায় সংস্থাপন শাখার শাখা সহকারী মো. আরিফ খান এবং মুনিরা খাতুনকে গত বছর অনুষ্ঠিত ১৯ নভেম্বরের উপকর কর্মকর্তা (ডিটিও) পদে পদোন্নতির লিখিত পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে দেয়া হয়নি। অথচ অঞ্চল-৩ এ কর্মরত ১৬তম গ্রেডের মো. সোহরাব হোসেনকে ওই উপকর কর্মকর্তা (ডিটিও) পদে পদোন্নতির জন্য লিখিত পরীক্ষার সুযোগ দেয়া হয়েছে। অথচ তার মূল পদ হিসাব সহকারী (১৬তম স্কেলের কর্মচারী)। যদিও মো. সোহরাব হোসেনকে বাছাই কমিটির অনুমোদনসাপেক্ষে রেভিনিউ সুপারভাইজারের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। আর অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে দেয়া হয় উপকর কর্মকর্তার।

অভিযোগ রয়েছে, সোহরাব হোসেন কর কর্মকর্তা হবার টার্গেট নিয়ে ইতোমধ্যেই সিন্ডিকেটের সঙ্গে একটি প্যাকেজ চুক্তিবদ্ধ হয়েছেন। আর এরই ধারাবাহিকতায় শিগগিরই বাছাই কমিটি-২ এর বৈঠকের মাধ্যমে তাকে রেভিনিউ সুপারভাইজার পদে নিয়মিত করে পরবর্তীতে বাছাই কমিটি-১ এর বৈঠক ডেকে উপকর কর্মকর্তা করার পরিকল্পনা করা হয়েছে। এরপর যেহেতু শিগগিরই একাধিক কর কর্মকর্তা অবসরে যাবেন আর তখন সেই সুযোগে সোহরাব হোসেনকে কর কর্মকর্তার দায়িত্ব দেয়া হবে বলে পরিকল্পনার কথা জানা যায়। এ বিষয়ে সোহরাব হোসেন বলেন, ‘আমি এসব চুক্তির বিষয় কিছু জানি না। আমি শ্রমিক লীগের নেতা, আমি চাইলে এর আগেই অনেক কিছুই করতে পারতাম। এসব তথ্য আপনারা কোথায় পান।’ নাম প্রকাশ না করার শর্তে ডিএসসিসির এক কর্মচারী জানান, আমরা বিভিন্ন ভর্তি পরীক্ষায় কিংবা নিয়োগ পরীক্ষায় অপেক্ষমাণ তালিকার কথা শুনেছি বা দেখেছি। কিন্তু পদোন্নতিতে ফল ঘোষণার পর কারো পদোন্নতি অপেক্ষমাণ থাকতে পারে এবং দুই মাস পর আবার সেই একজনকে পদোন্নতি দিয়ে আলাদাভাবে গেজেট প্রকাশ হয়, তা শুধু এ দক্ষিণ সিটির ডিটিওর পদোন্নতির পরীক্ষায়ই দেখতে পেলাম এবং কিছুটা আশ্চর্যন্বিতও হলাম।

জানা গেছে, গত বছরের নভেম্বরে ডিএসসিসিতে পদোন্নতির পরীক্ষা নিয়ে ডিসেম্বরে ১৮ জনকে ডিটিও পদে পদোন্নতি দিয়ে এর ফল ঘোষণা করে গেজেট প্রকাশ করা হয়। কিন্তু সহকারী সমাজকল্যাণ কর্মকর্তা মেহেদী হাসান খান যিনি সংস্থাপন শাখা-১ এর সহকারী সচিব (চলতি দায়িত্বে) হিসেবে তৎকালীন কর্মরত ছিলেন; তাকে ডিটিও পদে পদোন্নতি দিয়ে আবার দুই মাস পর অর্থাৎ চলতি বছরের ফেব্রæয়ারিতে সংস্থার সচিব আকরামুজ্জামান স্বাক্ষরিত আরেকটি গেজেট প্রকাশ করা হয়। যার স্মারক নং-৪৬.২০৭.০০০.০৩.০১.২০২.২০১২/১২০। ‘ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন কর্মচারী চাকুরী বিধিমালা-২০২১৯’ অনুযায়ী ৯ম গ্রেডভুক্ত সহকারী সচিব পদে পদোন্নতির ক্ষেত্রে একমাত্র ফিডার পদ ১০ম গ্রেডভুক্ত ‘প্রশাসনিক কর্মকর্তা’। অথচ প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের বঞ্চিত করে সম্পূর্ণ বিধিবহিভর্‚তভাবে ফিডারধারী নন এবং অপেক্ষাকৃত নিম্ন গ্রেডভুক্ত কর্মচারীদের সহকারী সচিব পদে চলতি দায়িত্ব প্রদান করে আদেশ জারি করা হয়।

জানা গেছে, মোহাম্মদ শাহজাহান, সংস্থাপন শাখা-২ এর সহকারী সচিব (চলতি দায়িত্ব)। তিনি ১৩তম গ্রেডের কর্মচারী হলেও বিধিবহিভর্‚তভাবে তাকে সহকারী সচিবের চলতি দায়িত্ব প্রদান করা হয়। অন্যদিকে মোহা. রোকনুজ্জামান, সংস্থাপন শাখা-৩ এর সহকারী সচিব (চলতি দায়িত্ব)। ১৪তম গ্রেডভুক্ত কেয়ারটেকার পদটি ফিডারভুক্ত পদ বিবেচনায় রোকনুজ্জামানকে ১০ম গ্রেডভুক্ত সহকারী সমাজকল্যাণ কর্মকর্তার পদে চলতি দায়িত্ব দেয়া হলেও পরবর্তিতে আবার ১০ম গ্রেডকে অতিক্রম করে ৯ম গ্রেডভুক্ত সহকারী সচিবের চলতি দায়িত্ব দেয়া হয়। অথচ তিনি এ পদে পদোন্নতির জন্য ফিডারধারীও নন। এ বিষয়ে সংস্থাপন শাখা-২ এর সহকারী সচিব (চলতি দায়িত্ব) মোহাম্মদ শাহজাহান বলেন, ‘এসব কর্তৃপক্ষের ব্যাপার, ফিডার মিডার নিয়ে আমাকে প্রশ্ন করলে তো হবে না। তাছাড়া আমি এর পূর্বে ১০ বছর রাজস্ব বিভাগের উপকর কর্মকর্তা পদে চলতি দায়িত্বে ছিলাম। আমি এ পদে ফিডারভুক্ত। আমার পদোন্নতি তো গত কয়দিন আগে বোর্ড সভায় হয়ে যেত একটু সমস্যার কারণে দেয়নি। শুধু প্রশাসনিক কর্মকর্তাসহ সচিব পদে ফিডারভুক্ত এমন প্রশ্নে তিনি কিছুটা উত্তেজিত হয়ে বলে, আমি সহ-সচিব আমি জানি ১৩তম গ্রেড সহ-সচিব পদে ফিডারভুক্ত।’

সংস্থাপন শাখা-৩ এর সহকারী সচিব রোকনুজ্জামান বলেন, এ বিষটি কর্তৃপক্ষের বিষয়। আমাকে কর্তৃপক্ষ এখানকার দায়িত্বে দিয়েছেন, তবে আমি এ পদের জন্য ফিডারভুক্ত নই। তফসিলে সহকারী সচিব-৩ পদটি নেই, তাহলে আপনাকে কীভাবে এ পদে চলতি দায়িত্বে দেয়া হলো- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বিষয়টি কর্তৃপক্ষের বিষয় আমি এ ব্যাপারে কিছু জানি না।’ এসব বিষয় জানতে ডিএসসিসির সচিব আকরামুজ্জামানের দপ্তরে বেলা ১২টায় গেলে অফিস সহকারী জানান, তিনি মিটিংয়ে আছেন, দেরি হবে। পরবর্তীতে সচিবের মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। যদিও বর্তমান মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপস দায়িত্ব গ্রহণের পরই ঘোষণা দিয়েছেন দুর্নীতির বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতা নীতির। তিনি বলেন, ‘অনিয়ম, ঘুষ, দুর্নীতি, জালিয়াতি, স্বজনপ্রীতি ডিএসসিসির উন্নয়নকে মারাত্মক বাধাগ্রস্ত করছে। আর এ দুর্নীতির কারণে অনেকাংশে উন্নয়নের সফলতা পাওয়া যায় না। ডিএসসিসিতে সব ধরনের দুর্নীতি ও জালিয়াতির বিরুদ্ধে দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।

 


আরো পড়ুন