শিরোনাম :

  • নয়াপল্টনে বিএনপির নেতাকর্মীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ জবানবন্দিতে বুলুসহ ১৫ বিএনপি নেতার নাম পেয়েছে পুলিশ সেনা অভ্যুত্থানবিরোধী বিক্ষোভে উত্তাল সুদান, সংঘর্ষে নিহত ৭দুই ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষ, নিহত ২
নবীজীর প্রতি ভালবাসা
মুহাম্মদ ইমদাদুল হক ফয়েজী
২৮ অক্টোবর, ২০২১ ১৯:৪২:৩৪
প্রিন্টঅ-অ+

নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের একান্ত আপনজন। জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত তিনি মানব ও জিন জাতির হেদায়াত ও কল্যাণ এবং বিশ্ববাসীর সুখ ও শান্তির জন্য উৎসর্গ করেছেন। জীবনের কোনো একটি ক্ষণও তিনি তাঁর ব্যক্তি স্বার্থের জন্য ব্যয় করেননি, এমনকি ঘুণাক্ষরে এ চিন্তাও করেননি। তাঁর আগমন ছিল পৃথিবীবাসীর জন্য সর্বশ্রেষ্ঠ উপহার, সর্বোচ্চ প্রাপ্তি এবং অশেষ অনুগ্রহ স্বরুপ। আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন, ‘আমি আপনাকে সৃষ্টিকুলের জন্য শুধু অনুগ্রহ হিসেবেই পাঠিয়েছ।’ (সূরা আম্বিয়া : আয়াত ১০৭)। আল্লাহ তায়ালা আরও ইরশাদ করেন, ‘হে নবী, নিশ্চয় আমি আপনাকে সাক্ষ্যদাতা, সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারীরুপে প্রেরণ করেছি।’ (সূরা আহযাব : আয়াত ৪৫) ।


মানবহত্যা, রাহাজানি, নৈরাজ্য, নারী-শিশু নির্যাতন, ব্যাভিচার, জুলুম-অত্যাচার, কুসংস্কার, অশ্লীলতা এককথায় সব পাপাচার, কদাচার আর ঘৃণ্য কাজকর্মে যখন পৃথিবী ছিল ধ্বংসের একেবারেই দ্বারপ্রান্তে, ঠিক তখন জগতের মহান অধিপতি আল্লাহ তায়ালা বিপর্যস্ত পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ কারিগর, বিশ্ব মানবতার মুক্তির দূত, সর্বকালের সর্বোত্তম পথপ্রদর্শক হিসেবে হেদায়াতের ঐশী আলো দিয়ে দুনিয়া ও দুনিয়াবাসীর জন্য সর্বোত্তম আদর্শ ও ত্রাণকর্তা হিসেবে আমাদের প্রাণপ্রিয় নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে প্রেরণ করেন। আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন, ‘অবশ্যই তোমাদের জন্য রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর মধ্যে রয়েছে উত্তম আদর্শ...।’ (সূরা আহযাব : আয়াত ২১)।


সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ এ মহামানবের আগমনে পৃথিবী থেকে ধীরে ধীরে যাবতীয় অন্ধকার, অনাচার, কলুষতা, পাপাচার বিদূরিত হয়। নতুন সঞ্জীবনী আলোর পরশ পেয়ে একটা সময় এ বসুন্ধরা সর্বশ্রেষ্ঠ আলোকচ্ছটায় আলোকিয় হয়। পৃথিবীর নিকৃষ্ট মানুষেরা তাঁর পরশপাথরের পবিত্র ছোঁয়ায় উৎকৃষ্ট মানুষের খেতাবে ভূষিত হন। এমনকি কেয়ামত পর্যন্ত পরবর্তী প্রজন্মের জন্য তাঁদের ঈমানকে আদর্শ মাপকাঠির স্বীকৃতি দেন মহান রব। আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন, ‘আর যখন তাদেরকে (মুনাফেকগণ) বলা হয় তোমরা বিশ্বাস স্থাপন করো (ঈমান) যেভাবে মানুষেরা (সাহাবায়ে কেরাম রা:) ঈমান এনেছেন, তখন তারা বলে আমরা কি ঈমান আনব বোকাদের মতো? মনে রেখো, প্রকৃতপক্ষে তারাই বোকা কিন্তু তারা তা বুঝে না।’ (সূরা বাকারা : আয়াত ১৩) ।


রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর অনুপম সান্নিধ্য ও আদর্শ আর ঐশী আলোর দ্বীপ্তিময় জ্যোতিতে পথহারা, দিকভ্রান্ত মানুষেরা হয়ে ওঠেন পৃথিবীর সোনার মানুষ, শ্রেষ্ঠ মানুষ, সাহাবায়ে কেরাম রা:। আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন, ‘আল্লাহ তাঁদের প্রতি সন্তুষ্ট এবং তাঁরাও আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্ট।’ (সূরা বায়্যিনাহ : আয়াত ৮)।


অনুরুপভাবে ইতিহাসের সবচে’ কালো অধ্যায়- ‘আইয়ামে জাহিলিয়াত’ বা ‘বর্বরতার যুগ’ পরিবর্তিত হয় শ্রেষ্ঠ যুগে। স্বীকৃতি পায় সোনালী যুগ হিসেবে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘উত্তম যুগ হচ্ছে আমার, সাহাবায়ে কেরামের যুগ অতঃপর তাবেয়িগণের যুগ...।’ (বোখারি ও মুসলিম)।


আমাদের নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিলেন, সাম্য-মৈত্রী, সৌহার্দ্য-সম্প্রীতি, প্রেম-ভালবাসার মূর্ত প্রতীক। সকল প্রকার বিভাজন, শ্রেণি-বৈষম্য, সাম্প্রদায়িকতা, বংশীয় কৌলীন্য, বর্ণবাদ, স্বজনপ্রীতি, দাসত্ব-পরাধীনতা, ক্ষমতার দাপট, একনায়কতন্ত্র, জুলুম-অত্যাচার, শোষণ-অবিচার তথা যাবতীয় অনাচারের প্রাচীর ভেঙে সুন্দর নতুন পৃথিবী নির্মাণ আর মনুষ্যত্বের আলোয় উদ্ভাসিত আদর্শ সর্বোত্তম জাতি গঠন করাই ছিল তাঁর মিশন। এ মহান লক্ষ্যের ওপর তিনি তাঁর জীবনের প্রতিটি ক্ষণ-অনুক্ষণ বিশ্ববাসীর জন্য ব্যয় করেছেন। পরবর্তী প্রজন্মের জন্য তাঁর উত্তম আদর্শ ইতিহাসের পাতায় সোনার হরফে খচিত। প্রায় পনের শত বছর ধরে দুনিয়াবাসী তাঁর রেখে যাওয়া জীবনচরিত থেকে কত কিছুই যে অর্জন করছে- তার কোন ইয়ত্তা নেই। আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন, ‘আপনি অবশ্যই মহান চরিত্রের অধিকারী।’ (সূরা কালাম : আয়াত ৪)।


যদি মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর আগমন না হতো, তাহলে হয়তো পৃথিবী অন্ধকার থেকে বের হতে পারত না, মনুষ্যত্বহীনতা আর সাম্প্রদায়িকতার লেলিহান আগুনে জ্বলেপুড়ে অঙ্গার হয়ে যেত, ধ্বংসাবশেষ ছাড়া আর কিছুই অবশিষ্ট থাকত না। নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সময় থেকে আজ পর্যন্ত এ মহাসত্য অসংখ্য ভিন্ন ধর্মাবলম্বী নির্দ্বিধায়, অনায়াসে স্বীকার করেছেন। তারা তাঁকে জগতের সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব, মানবতার মুক্তির স্বর্গীয় দূত এবং ব্যক্তি, জাতি ও রাষ্ট্র গঠনের সর্বোচ্চ আদর্শ আখ্যায়িত করতে কৃপণতা করেননি।


প্রিয় নবীজী সা. আমাদের সর্বোচ্চ প্রিয়জন। তাঁর প্রতি আমাদের হৃদয়ের সবটুকু ভালবাসা, অবারিত ভালবাসা। তিনি প্রতিটি মোমিনের কলজের টুকরো, আত্মার আত্মীয়, অকৃত্রিম ভালবাসার নয়নমণি। তিনি অতুলনীয়, তিনি নিষ্কলুষ চরিত্র ও সর্বোত্তম আদর্শের অধিকারী, তিনি সকল নবী-রাসুলের নেতা। মাঝেমধ্যে মানুষরূপী কিছু কুলাঙ্গার, হিংস্র জানোয়ার তাদের হীন স্বার্থ হাসিলের জন্য পরিকল্পিতভাবে আমাদের প্রাণপ্রিয় নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর মানহানি করতে পাগল, মাতাল, উন্মাদ হয়ে ওঠে। যা মুমিনমাত্র যে কারও হৃদয়ে রক্তক্ষরণ ঘটায়। যারা রাসূলকে সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে নিয়ে ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ করে, তাঁর মহান চরিত্রে কালিমা লেপন করে, তাঁকে কটূক্তি করে, আল্লাহ তায়ালা তাদের ভয়াবহ পরিণতির কথা বর্ণনা করে বলেন, ‘যারা আল্লাহর রাসূলকে কষ্ট দেয় তাদের জন্য রয়েছে যাতনাদায়ক শাস্তি।’ (সূরা তাওবা : আয়াত ৬১)। আল্লাহ আরও বলেন, ‘নিশ্চয় আপনার প্রতি বিদ্বেষপোষণকারীই নির্বংশ-লেজকাটা।’ (সূরা কাওসার : আয়াত ৩)। 


প্রিয় নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহ তায়ালা, সব নবী-রাসূল, মুসলমান এবং বিশ্ববাসীর কাছে অনন্য মর্যাদার অধিকারী এবং বিশেষভাবে সম্মানিত। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘আর আমি (আপনার মর্যাদা বৃদ্ধির জন্য) আপনার স্মরণকে সমুন্নত করেছি।’ (সূরা ইনশিরাহ : আয়াত ৪)।


নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর প্রতি সর্বোচ্চ ভালবাসা আমাদের ঈমানের দাবী। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে মন, মনন, চিন্তা ও চেতনায় ধারণ ও লালন করা, তাঁর আদর্শকে গ্রহণ ও প্রাধান্য দেয়া এবং তাঁকে হৃদয়ের সর্বোচ্চ ভালবাসায় সম্মানিত করা ব্যতিত কেউ পূর্ণ মোমিন হতে পারবে না। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘তোমাদের কেউ ততক্ষণ পর্যন্ত মোমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না আমি তার কাছে তার পিতা, সন্তান এবং অন্যান্য লোকের তুলনায় অধিক প্রিয় হব।’ (বোখারি, মুসলিম)। 


লেখক : শিক্ষক  


 

আরো পড়ুন