শিরোনাম :

  • নয়াপল্টনে বিএনপির নেতাকর্মীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ জবানবন্দিতে বুলুসহ ১৫ বিএনপি নেতার নাম পেয়েছে পুলিশ সেনা অভ্যুত্থানবিরোধী বিক্ষোভে উত্তাল সুদান, সংঘর্ষে নিহত ৭দুই ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষ, নিহত ২
মো. মনিরুল ইসলাম
মুক্তিযুদ্ধে আলেম সমাজ
১৯ মে, ২০২২ ২০:২৮:০৯
প্রিন্টঅ-অ+


১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক চলচ্চিত্র কিংবা নাটকে দাড়ি-টুপিওয়ালা ব্যক্তিদের সাধারণত মুক্তিযুদ্ধের খলনায়ক, ধর্ষক, দুশ্চরিত্রা বা রাজাকার হিসেবে প্রদর্শন করা হয়। অথচ একাত্তরের দাড়ি টুপিওয়ালা অসংখ্য আলেমদের ইতিবাচক ভূমিকা থাকলেও তা আমাদের অনেকের অজানাই রয়ে গেছে। অসংখ্য আলেম সমাজ মুক্তিযুদ্ধের স্বাধীনতা সংগ্রামে অঢেল অবদান রেখেছেন। কেউ কেউ সরাসরি মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছে। কেউ বা যুদ্ধে না যেতে পেরে পরোক্ষভাবে মুক্তিযুদ্ধে অবদান রেখেছেন। কেউ বা পালিয়ে পালিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের বিভিন্নভাবে সাহায্য সহযোগিতা করেছেন। আবার অনেকেই মুক্তিযুদ্ধের সংগ্রামের যেতে উৎসাহ, অনুপ্রেরণা দিয়েছে। 


অসংখ্য আলেমগণ মুক্তিযুদ্ধের সংগ্রামে অংশগ্রহণ করার ফলে পাক হানাদার বাহিনী ও তাদের ঘরবাড়ি আগুনে পুড়ে বিধ্বংস করেছে। মাওলানা আব্দুর রশিদ তর্কবাগীশ ২৪৩ দিন আত্মগোপনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন এবং তারই পরামর্শ অসংখ্য মানুষ মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেয়। এরই পরিপ্রেক্ষিতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীরা তার বাড়িঘর আগুনে পুড়িয়ে দেয়। 


২৬ মার্চ পাকহানাদারদের গুলিতে প্রাণ হারান ঢাকার হাতিরপুল মসজিদের ইমাম, বৃহত্তর ময়মনসিংহের ইমাম মাওলানা ইরতাজ কাসেমপুরী পরাধীন দেশের জুমার নামাজে ইমামতি করতে অস্বীকৃতি জানালে পাকহানাদাররা তাকে নির্মমভাবে গুলি করে হত্যা করে। এই ইরতাজ আলী কাসিমপুরীর কথা হুমায়ুন আহমেদের বিখ্যাত উপন্যাস জোসনা ও জননীর গল্পে তা উল্লেখ করেন।


স্বাধীনতাকে ইসলাম সমর্থন দেয় দাসত্ব বা গোলামিকে নয়। সে কারণে আলেমদের সিংহভাগ অংশ পাকিস্তানি শাসকদের জুলুম, অত্যাচার, নিপীড়ন, নির্যাতনের প্রতিবাদ করেছে। তাদের অবস্থান ছিল কোরআন-হাদিস সমর্থিত। নীরবে-নিভৃতে অসংখ্য আলেমসমাজ প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে মুক্তিযুদ্ধের সংগ্রামে অগ্রণী ভূমিকা রেখেছেন। যশোর রেল ইস্টিশনে মাদরাসার মুহতামিম দেওবন্দ ফারেগ মাওলানা আবুল হাসান যশোরী এবং তার মাদরাসার ছাত্ররা মুক্তিযুদ্ধের সমর্থনের পাশাপাশি মুক্তিযুদ্ধের সংগ্রামে অংশ নেয়।


 ১৯৭১ সালের ৮ এপ্রিল পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী হামলা করে। শহীদ হন ২১ জন। যাদের মধ্যে একজন শ্রেষ্ঠ আলেম হাবিবুর রহমান এবং বাকিরা ছিল ওখানে আশ্রয় নেয়া মুক্তিযোদ্ধারা। এমনকি মাদরাসার প্রাঙ্গণে শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের কবর রয়েছে। অন্যথায়, পুরাণ ঢাকার পীর জুরাইনের নির্দেশে অসংখ্য মুরিদ মুক্তিযুদ্ধের সংগ্রামে অংশগ্রহণ করে। জুরাইনের পীর সাহেব সরাসরি মুক্তিযুদ্ধকে সমর্থন দিয়েছেন।


মুক্তিযুদ্ধের সময় প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান পটিয়া মাদরাসার আশ্রয় নিয়েছিলেন। তখন তাকে আশ্রয় দিয়েছিলেন অত্র মাদ্রাসার মুহতামিম আল্লামা দানেশ রাহমাতুল্লাহ আলাইহি। এমনকি মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে যখন আলেম-ওলামাদের প্রশ্ন করা হয়, তখন প্রতিউত্তরে তারা বলে পাকিস্তানিরা হচ্ছে জালেম আর আমরা হচ্ছি মজলুম সুতরাং যুদ্ধে অংশগ্রহণ করা আমাদের জন্য ফরয। পরবর্তীতে জনসাধারণ পাক হানাদার বাহিনীদের বিরুদ্ধে আরও সৌচ্চার অবস্থান গ্রহণ করে। পাক হানাদার বাহিনীদের বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধে বীরত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার জন্য অনেকে খেতাবও পান। এর মধ্যে কিছু আমরা উল্লেখ করতে পারি-


সেই সময়ে বাংলাদেশের শীর্ষ আলেম হাফেজ্জী হুজুর মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে রাজনৈতিক ও নৈতিক অবস্থান নেন। তিনি পাকিস্তানদের জালেম এবং মজলুমের লড়াই বলে অভিহিত করেন। মুক্তিযোদ্ধা মাওলানা এমদাদুল হক আড়াইহাজারী তার মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেওয়া প্রসঙ্গে বলেন- আমি হাফেজ্জী হুজুরের খুব ভক্ত ছিলাম। যুদ্ধ চলাকালীন অনেক ছাত্র ট্রেইনিং নিচ্ছিল। আমি হাফেজ্জী হুজুরের কাছে পরামর্শ চাইলাম যে আমি ট্রেইনিং এ যাব কিনা? এখন আমি কি করব?


তিনি আমাকে বলেন, পাকিস্তানীরা বাঙালিদের উপর অত্যাচার করছে। সুতরাং তারা জালেম। জুলুম আর ইসলাম কখনো এক হতে পারে না। তুমি যদি খাঁটি মুসলমান হও, ইসলাম মানো, তবে পাকিস্তানীদের পক্ষে চাও কিভাবে? এটা তো ইসলামের সঙ্গে কুফুরের যুদ্ধ নয়; বরং এটা হলো জালেমের বিরুদ্ধে মজলুমের প্রতিবাদ-প্রতিরোধ।


তিনি মুক্তিযুদ্ধের জালেমের বিরুদ্ধে মাজলুমের ন্যায়যুদ্ধ বলে তার অনুসারীদের মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিতে উৎসাহ, অনুপ্রেরণা দিয়েছেন।


শাইখুল হাদিস মাওলানা আজিজুল হক অর্থাৎ (বর্তমান আলোচিত আলেম শাইখ মামুনুল হকের বাবা) মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতিপর্বে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে ৩২ নম্বর ধানমন্ডিতে দীর্ঘ বৈঠক করেন। এ বৈঠকের পর মাওলানা আজিজুল হকের প্রশংসা করে শেখ সাহেব (শেখ মুজিবুর রহমান) পত্রিকায় একটি বিবৃতি দিয়েছিলেন। এরকম অসংখ্য আলেম-ওলামা মুক্তিযুদ্ধের ভূমিকায় চূড়ান্ত অবদান রেখেছে। বলা যায়, এক বিশাল আলেম সমাজ এই স্বাধীন বাংলাদেশের মূল হাতিয়ার। যাদের অবদান আকাশচুম্বী।।


লেখক : শিক্ষার্থী; ইংরেজি বিভাগ, সরকারি আকবর আলী কলেজ, উল্লাপাড়া, সিরাজগঞ্জ



 

আরো পড়ুন